সজনে পাতার হেলথ বেনিফিটস | ডায়েট চার্টে কেন রাখবেন এই হার্বটি?

ফারিহা সুলতানা · Sep 04, 2022 · 1 min read

সজনে পাতার হেলথ বেনিফিটস | ডায়েট চার্টে কেন রাখবেন এই হার্বটি?

সজনে গাছ আমাদের দেশের অতি পরিচিত ও সহজলভ্য একটি গাছ। মোটামুটি মফস্বলে বা গ্রামে সবার বাসার পাশেই সজনে গাছের উপস্থিতি দেখা যায়। সজনে গাছের ইংরেজি নাম ‘Drumstick’ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে এর দ্বিপদ নাম Moringa Oleifera। সজনে গাছের নানাবিধ ঔষধি গুণের জন্য দেশি-বিদেশি বিজ্ঞানীরা এই গাছকে ‘Miracle Tree’ বা ‘অত্যাশ্চর্য বৃক্ষ’ বলে অভিহিত করেন। খুব পরিচিত এই গাছটির গুণ আসলেই বলে শেষ করা যাবে না। সজনে গাছ মাঝারি আকৃতির হয়ে থাকে এবং এতে ছোট ছোট পাতা থাকে। সজনে ডাটা ও সজনে শাক খাবার হিসেবে মোটামুটি বেশ জনপ্রিয় একটি জায়গা দখল করে আছে বাঙালির হেঁশেলে। তবে শুধুমাত্র সবজি হিসেবে সুস্বাদুই নয়, সজনে পাতার আছে নানারকমের ঔষধি গুণও, যার জন্য তাকে বলা হয়ে থাকে ‘Natural Multi Vitamin Plant’। সজনে পাতার হেলথ বেনিফিটস সম্পর্কে আমরা আজ জানবো। আজকের ফিচার থেকেই আপনারা জানতে পারবেন ডায়েট চার্টে এই হার্বটি রাখা কেন প্রয়োজন।

সজনে পাতার হেলথ বেনিফিটস কী কী? 

পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ সজনে আমাদের অনেকেরই বেশ পছন্দের একটি খাবার। কিন্তু এই গাছের পাতারও যে হেলথ বেনিফিটস আছে সেটা খুব কম মানুষই জানেন। সজনে পাতার নানা পুষ্টিগুণের কারণে এটি যেমন স্বাস্থ্যের জন্য ভালো, তেমনই একে ঔষধি হিসেবেও মানা হয়। আজ আমরা জানবো সজনে পাতার নানা হেলথ বেনিফিটস সম্পর্কে।

সজনে পাতার পুষ্টিগুণ 

অন্যান্য যে কোনো সবজির তুলনায় পুষ্টিদ্রব্যের দিক থেকে সজনে পাতা অনেক বেশি সমৃদ্ধ। এতে প্রায় ৮ ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিড আছে এবং প্রায় ৩৮% এর বেশি আমিষ আছে, যা কিনা অন্য কোনো সবজিতে বা পাতায় খুব সহজে পাওয়া যায় না। যারা নিরামিষাশী, তাদের জন্য আমিষের অন্যতম ভালো একটি উৎস হলো সজনে পাতা। এছাড়াও পরিমাণের দিক থেকে যদি বিবেচনা করা হয়, একই পরিমাণ সজনে পাতায় আছে-

সজনে পাতার হেলথ বেনিফিটস
  • কমলালেবুর তুলনায় ৭ গুণ বেশি ভিটামিন-সি
  • দুধের তুলনায় ৪ গুণ বেশি ক্যালসিয়াম এবং ২ গুণ আমিষ
  • ডিমের তুলনায় ২ গুণ বেশি প্রোটিন
  • গাজরের তুলনায় ৪ গুণ বেশি ভিটামিন-এ
  • কলার তুলনায় প্রায় ৩ গুণ বেশি পটাশিয়াম

এছাড়াও দৈনন্দিন কাজ করার জন্য এবং শরীরকে ঠিকঠাক রাখার জন্য আমাদের শরীরে যে ম্যাক্রো ও মাইক্রো উপাদানগুলো দরকার হয় তার মধ্যে সজনেতে আছে-

  • ৪২% আমিষ
  • ১২৫% ক্যালসিয়াম
  • ৬১% ম্যাগনেসিয়াম
  • ৪১% পটাশিয়াম
  • ৭১% লৌহ
  • ২৭২% ভিটামিন-এ
  • ২২% ভিটামিন-সি

এক টেবিল চামচ সজনের গুঁড়া একটি শিশুর দৈনন্দিন আমিষ চাহিদা মেটানোর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি পরিপূরক খাবার। আবার দৈনিক ৬ চামচ সজনে পাতার গুঁড়া একজন গর্ভবতী মায়ের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। তাই এই বৃক্ষকে অনেক জায়গাতে ‘মায়েদের উত্তম বন্ধু’ও বলা হয়।

সজনে পাতার ঔষধি গুণ

বিজ্ঞানীরা পুষ্টির দিক থেকে মরিঙ্গা বা সজনে পাতাকে ‘পুষ্টির ডায়নামাইট’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এরকমটা কেন, তার কিছুটা প্রমাণ উপরের পুষ্টি চার্টেই অনেকটা স্পষ্ট। কিন্তু এই সজনে পাতার গুণ আসলে মানুষের কোন কোন রোগে কাজে দেয়? কাদেরই বা খাওয়া উচিত? সেগুলো খুঁজে নেওয়া যাক বরং এবার!

সজনে পাতার ঔষধি গুণ

উচ্চ রক্তচাপ কমায়

প্রতিদিন ৪-৬ চামচ সজনে পাতার গুঁড়া উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এতে করে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আসে, হঠাৎ রক্তচাপ ওঠানামা করা স্তিমিত হয়। তাই নিয়মিত সজনে পাতার গুঁড়া খেলে আস্তে আস্তে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ পরিহার করা যেতে পারে।

খাবারের রুচি ফেরাতে সাহায্য করে

দীর্ঘদিন রোগ ভোগ বা অন্যান্য কারণে যাদের খাবারের প্রতি অনীহা বা অনিচ্ছা জন্মায় তাদের জন্য সজনে পাতা হতে পারে একটি কার্যকরী সমাধান। এটি খাবারের অরুচি কমিয়ে আনতে সাহায্য করে বেশ ভালোভাবে।

অ্যানিমিয়া দূর করে

সজনে পাতায় প্রচুর পরিমাণে আয়রন থাকে যা কিনা আমাদের রক্তের লোহিত কণিকার অন্যতম উপাদান। তাই নিয়মিত সজনে পাতা খাওয়া আপনার অ্যানিমিয়ার সমস্যা দূর করতে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখে

সজনে পাতার হেলথ বেনিফিটসের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হলো, এটি আপনার কোলেস্টেরলকে আশ্চর্যরকমভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখে, রক্তের খারাপ চর্বিগুলোকে কমাতে সাহায্য করে। এছাড়াও শরীরের সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রণ করে। তাই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে অন্যতম সহায়ক একটি উপাদান এই সজনে পাতা।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সজনে পাতা

অন্ধত্ব দূর করতে সাহায্য করে 

অন্ধত্ব দূর করতে সজনে পাতার কার্যকারিতা রয়েছে। এই পাতায় প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-এ থাকে, যা কিনা আমাদের দৃষ্টিশক্তিকে ভালো রাখতে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে প্রয়োজন। তাই অন্ধত্ব দূর করতে সজনে পাতা অপ্রতিদ্বন্দ্বী একটি উপাদান!

ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে

সজনে পাতার বেশ কিছু উপাদান একসাথে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে বেশ ভালোভাবে লড়াই করে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার কোষগুলোর বৃদ্ধি ধীর করে দিতে সজনে পাতার রস অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

প্রিম্যাচিউর এজিং সাইনস প্রিভেন্ট করে

সজনে পাতায় প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট থাকায় এটি ত্বকে বয়সের ছাপ দ্রুত পড়তে দেয় না এবং যে কোনো প্রদাহে দ্রুত সাড়া দেয়। যার জন্য ক্ষত সারানো বা প্রদাহ দমনে বেশ কার্যকরী ভূমিকা রাখে এই সজনে পাতা।

হার্ট ভালো রাখে

কোলেস্টেরল ও ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখার মাধ্যমে হার্টের উপর রক্তের প্রবাহ ও চাপ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে সজনে পাতা। তাই এই পাতার অন্যতম একটি গুণ হলো এটি আপনার হার্টকে সুস্থ রাখে অনেক বয়স পর্যন্ত!

ওজন কমাতে সাহায্য করে

বর্তমান সময়ের ডায়েটিশিয়ান ও মিল প্ল্যানারদের কাছে সজনে পাতা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। কারণ সজনে পাতায় থাকা উপাদানগুলো মেটাবলিজমে সাহায্য করে, যার জন্য খাবার হজম হয় দ্রুত। অন্ত্রের স্বাস্থ্য রক্ষায় এই পাতার গুঁড়ার কোনো জুড়ি নেই! তাই ডায়েটিশিয়ানরা পরামর্শ দেন প্রতিদিন সকালে ২ চা চামচ সজনে পাতার গুঁড়া বা রসের সাথে অর্ধেক লেবুর রস ও এক চা চামচ মধু মিশিয়ে খেতে, এতে সারাদিনের খাবারগুলো হজম হয় দ্রুত এবং খুব বেশি চর্বি শরীরে জমা হতে পারে না।

ওজন কমাতে সজনে পাতা বেশ উপকারী

সজনে পাতার হেলথ বেনিফিটস অর্থাৎ স্বাস্থ্যগুণের কথা আসলেই অনন্য এবং তালিকার দিক দিয়েও লম্বা। গ্রীষ্মপ্রধান দেশগুলোর সুবিধা হলো, এ জায়গাগুলোতে সজনে গাছ সারা বছরই থাকে এবং ফলনও দেয়। যার জন্য সতেজ পাতা দিয়েই কাজ করা সম্ভব। শীতপ্রধান দেশগুলোর মতো তাই সুপারশপ থেকে বেশি দামে সজনে গুঁড়া কিনে খাওয়ার ঝামেলা নেই। যেহেতু ঘরের পাশেই এত উপকারী এক গাছের চাষ করা সম্ভব এবং প্রক্রিয়াও খুব বেশি কঠিন নয়, তাই আমাদের উচিত সুযোগ থাকলে বাসায় সজনে গাছ লাগানো এবং এর পাতার যথাযথ ব্যবহার করা। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।

  ছবিঃ সাটারস্টক

সম্পর্কিত লেখা

রূপচর্চায় সজনে পাতা | ত্বক ও চুলের যত্ন নিন প্রাকৃতিক উপায়ে!
রিভিউ

রূপচর্চায় সজনে পাতা | ত্বক ও চুলের যত্ন নিন প্রাকৃতিক উপায়ে!

ঝলমলে স্বাস্থ্যজ্জল চুল পেতে এবং ত্বকের নানা সমস্যা প্রতিরোধ করে ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে তুলতে সজনে পাতার জুড়ি নেই। কি অবাক হচ্ছেন? হওয়ারই কথা! “সজনে...

ত্বক ও চুলের যত্নে সজনে পাতা কীভাবে ব্যবহার হয় জানা আছে কি?
বিউটি টিপস

ত্বক ও চুলের যত্নে সজনে পাতা কীভাবে ব্যবহার হয় জানা আছে কি?

‘সজনে বা সজিনা’ ডাটা সবজি হিসাবে আমাদের কাছে বেশি পরিচিত। ডাল দিয়ে সজনে ডাটা অনেকের প্রিয় একটি খাবার। সজনে গাছের বৈজ্ঞানিক নাম মরিঙ্গা অলিফেরা। এই মরি...

ইনডোর প্ল্যান্টের যত্ন নিতে খেয়াল রাখুন ৯টি বিষয়ে
গৃহসজ্জা

ইনডোর প্ল্যান্টের যত্ন নিতে খেয়াল রাখুন ৯টি বিষয়ে

খুব শখ করে পছন্দের ইনডোর প্ল্যান্টস এনে ঘর সাজালেন। কিছুদিন গাছ ভালো থাকলেও অল্প দিনেই কেমন যেন গাছ দুর্বল হয়ে পাতা ঝরতে লাগলো, ডাল মরে গেলো কিংবা গাছ...

বর্ষাকালে গাছ বাঁচিয়ে রাখার জন্য যত্ন নিন ৯টি উপায়ে
গৃহসজ্জা

বর্ষাকালে গাছ বাঁচিয়ে রাখার জন্য যত্ন নিন ৯টি উপায়ে

ব্যস্ত এই শহরে মানুষ অল্প হলেও সবুজের দেখা পেতে চায়। জায়গার যথেষ্ট অভাব থাকার কারণে নগরের বাসিন্দারা তাই ছোটখাটো পরিসরে বারান্দায়, কেউবা ছাদে গাছ লাগি...

আরও পড়ুন

পুদিনার ১১টি অসাধারণ গুণ!
সুস্থতা

পুদিনার ১১টি অসাধারণ গুণ!

পুদিনা একটি গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। পুদিনার মূল থেকে শুরু করে ফুল পর্যন্ত - সবই ব্যবহারযোগ্য। প্রাচীনকাল থেকেই ঔষধি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে পুদিনা। তাই খ...

নিম পাতার ব্যবহার | ত্বক, চুল ও স্বাস্থ্য রক্ষায় ১১টি টিপস!
ত্বকের যত্ন

নিম পাতার ব্যবহার | ত্বক, চুল ও স্বাস্থ্য রক্ষায় ১১টি টিপস!

মুখে একটা ব্রণ হলে বা ত্বকের কোন সমস্যা হলেই আমাদের দুশ্চিন্তা শুরু হয়ে যায়। এই দুশ্চিন্তায় একটা ব্রণের জায়গায় আমরা দুই তিনটি ব্রণ বানিয়ে ফেলি। অথচ হা...

গ্রিন টি ও থানকুনি পাতার নির্যাস দিয়ে একনে প্রন স্কিনের যত্ন
একনে-প্রন

গ্রিন টি ও থানকুনি পাতার নির্যাস দিয়ে একনে প্রন স্কিনের যত্ন

ব্রণ, সবার কমন শত্রু! আমাদের দেশের মতো গরমকাল প্রধান দেশগুলোতে সোয়েটিং খুব কমন একটি বিষয়। ঘাম থেকে তেল আর গরমের কারণে তৈলাক্ত বা শুষ্ক ত্বকের সমস্যার...

চুলের খুশকি দূর করতে নিম পাতার ৪টি ব্যবহার সম্পর্কে জেনে নিন!
চুলের যত্ন

চুলের খুশকি দূর করতে নিম পাতার ৪টি ব্যবহার সম্পর্কে জেনে নিন!

খুশকি একটি সাধারন সমস্যা কিন্তু খুব যন্ত্রণাদায়ক। শীত, গ্রীষ্ম কী বর্ষা কম-বেশি সব ঋতুতেই ভিন্ন ভিন্ন কারণে খুশকি দেখা যায় চুলে। খুশকি আপনার চুলের ও ম...

ঘরের বাতাস বিশুদ্ধ করে তুলতে বাসগৃহে রাখুন ৫টি গাছ
গৃহসজ্জা

ঘরের বাতাস বিশুদ্ধ করে তুলতে বাসগৃহে রাখুন ৫টি গাছ

আমাদের যান্ত্রিক এই শহরে গাড়ি, কলকারখানার সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে বাতাসে থাকা বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের পরিমাণ এবং পরিবেশ দূষণ। তবে এই...

…