হাই রিস্ক প্রেগনেন্সি | ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থায় হবু মায়ের প্রয়োজন একটু বাড়তি যত্ন!

ডাঃ মারুফা আক্তার · Oct 18, 2021 · 1 min read

হাই রিস্ক প্রেগনেন্সি | ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থায় হবু মায়ের প্রয়োজন একটু বাড়তি যত্ন!

প্রেগনেন্সি মেয়েদের জীবনের খুব জটিল ও জরুরী সময়। সাধারণত সুস্থ, সবল, জটিলতাহীন প্রেগনেন্সি পিরিয়ড সকল হবু মায়ের কাম্য। একজন নারী যখন গর্ভধারণ করেন তখন তাকে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যার মোকাবেলা করতে হয়। এই সকল স্বাস্থ্য সমস্যা যদি গর্ভবতী মা এবং গর্ভের সন্তানের জীবন নাশের সম্ভাবনা হিসেবে দেখা দেয়, তখনই তাকে হাই রিস্ক প্রেগনেন্সি বা ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা বলে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এ ধরনের সমস্যা সন্তান জন্মদানের সময় যত এগিয়ে আসে তত বাড়তে থাকে, আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে মায়েদের গর্ভধারণের আগের থেকেই বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কারণে সৃষ্টি হয়। হাই রিস্ক প্রেগনেন্সি বা ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা কেন হয় এবং এক্ষেত্রে করণীয়গুলো কী কী সেগুলোই আমরা জেনে নিবো আজকের আর্টিকেলে।

হাই রিস্ক প্রেগনেন্সির কারণসমূহ

১) কোনো মায়ের যদি গর্ভধারণের আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্ট, কিডনি সমস্যা, হেপাটাইটিস জাতীয় রোগ থেকে থাকে তাহলে গর্ভকালীন সময়ে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। তিনি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভবতী মা হিসাবে বিবেচিত হবেন।

২) অতিরিক্ত ওজন বা স্থুলতা গর্ভাবস্থায় ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। এর ফলে প্রি-একলাম্পসিয়া, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, মৃত সন্তান প্রসব এমনকি সিজারিয়ান এর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে যে স্থুল মায়েদের সন্তানদের হার্টের সমস্যা নিয়ে জন্ম নেয়ার সম্ভাবনা ১৫% বৃদ্ধি পায়।

৩) গর্ভে একের অধিক সন্তান বা টুইন প্রেগনেন্সির ক্ষেত্রে গর্ভকালীন ঝুঁকি বেড়ে যায়। এটাও হাই রিস্ক প্রেগনেন্সি এর মধ্যে ধরা হয়। এক্ষেত্রে অপরিনত শিশুর জন্ম বা সময়ের আগে জন্ম নেওয়ার হার বৃদ্ধি পায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে টুইন বা ট্রিপলেট প্রেগনেন্সি ৩৭ সপ্তাহের আগেই ডেলিভারি হয়ে যায়।

৪) মায়ের বয়স হাই রিস্ক প্রেগনেন্সির ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ১৮ বছর বয়সের কম বা ৩৫ বছর বয়স এর বেশি বয়সে সন্তান ধারণ করতে গেলে গর্ভকালীন জটিলতা অনেক বেড়ে যায়।

৫) প্ল্যাসেন্টা বা গর্ভফুল সঠিক অবস্থানে না থেকে নিচের দিকে বা জরায়ু মুখের কাছে থাকলে তাকে প্ল্যাসেন্টা প্রিভিয়া বলে। এক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় হালকা থেকে ভারি রক্তপাত হয়ে থাকে। যদি প্ল্যাসেন্টার অবস্থান ঠিক না থাকে তবে সেক্ষেত্রেও অনেক জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়।

৬) আগে যদি মিসক্যারেজ, বাচ্চার হার্টবিট না আসা, ব্লিডিং, মৃত সন্তান প্রসবের মতো হিস্ট্রি থাকে, পরবর্তী গর্ভাবস্থা বা আবার যখন কনসিভ করবেন সেটা হাই রিস্ক প্রেগনেন্সি হিসাবে ট্রিটেড হবে।

ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থার লক্ষণ কী কী?

  • ভ্যাজাইনাল ব্লিডিং
  • বার বার কন্ট্রাকশন বা জরায়ুর সংকোচন প্রসারণ
  • ভ্যাজাইনাতে ব্যথা ও জ্বলুনি হওয়া
  • তলপেটে অতিরিক্ত ব্যথা হওয়া
  • বাচ্চার নড়াচড়া কমে যাওয়া
  • প্রচন্ড মাথাব্যথা
  • চোখে ঝাপসা দেখা
  • পায়ে বা শরীরে হটাত করে পানি আসা বা মুখ ফুলে যাওয়া

হাই রিস্ক প্রেগনেন্সিতে হবু মায়ের যত্ন

একটি গবেষণায় দেখা গেছে আমাদের দেশে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ গর্ভধারণ ঝুঁকিপূর্ণ। যদি কোন গর্ভবতী মা হাই রিস্ক প্রেগনেন্সি হিসেবে চিহ্নিত হন, তাহলে মা এবং তার চিকিৎসক মিলে প্রসবপূর্ব চেকআপের একটি রুটিন বা ছক করে নিতে হবে। তাতে যা যা থাকতে পারে,

১) রুটিন চেকআপ ছাড়াও বাড়তি চেকআপ, টেস্ট এবং আল্ট্রাসাউন্ড। ২) স্বাস্থ্যকর একটি ডায়েট চার্ট মেনে চলা এবং ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনমতো ব্যায়াম করা। ৩) হাই রিস্ক প্রেগনেন্সির লক্ষণ সম্পর্কে নিজে জানা এবং পরিবারের সকল সদস্যকে এ সম্পর্কে অবহিত করা। ৪) সকল ধরনের জরুরী অবস্থার জন্য মানসিক ও আর্থিকভাবে প্রস্তুত থাকা। ৫) হাই রিস্ক প্রেগনেন্সি মায়ের উপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। এই চাপ দূর করার উপায় বের করা এবং চাপ মুক্ত থাকা। ৬) চিকিৎসকের মূল লক্ষ্যই হল মা এবং শিশুর সার্বিক সুস্থতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাই সবসময় চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা। ৭) যেকোনো সমস্যায় যেকোনো সময় চিকিৎসককে জানাতে দ্বিধা বা ভয় না করা। ৮) খুব বেশী রিস্কি প্রেগনেন্সির ক্ষেত্রে দরকার হলে ঘরে বা হাসপাতালে বেড রেস্টে থাকতে হতে পারে।

প্রেগনেন্সিতে রিস্ক কমানোর উপায়

  • ওজন ঠিক রাখতে হবে, কিন্তু ওজন কমাতে যেয়ে আন্ডার ওয়েট হওয়া যাবে না
  • স্বাস্থ্যসম্মত ডায়েট মেনে চলতে হবে এবং তাতে অবশ্যই তাজা ফলমূল এবং সবজি থাকতে হবে
  • পরিমিত ঘুম এবং বিশ্রাম গ্রহণ করতে হবে
  • কফি বা ক্যাফেইন জাতীয় খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে যেতে হবে
  • গর্ভাবস্থায় নিয়মিত চেকআপ করাতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে

গর্ভাবস্থায় সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও যদি পূর্বে কোনো রোগ যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ-রক্তচাপ, জন্ডিস, হার্টের সমস্যা ইত্যাদি থাকে তবে সে সম্পর্কে চিকিৎসককে জানাতে হবে। এই সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হালকা ব্যায়াম করতে হবে, তবে বেড রেস্ট দিলে সেই ইন্সট্রাকশন ফলো করবেন। প্রতিটি প্রেগনেন্সি-ই আলাদা, তাই আপনার শারীরিক কন্ডিশন বুঝে ডাক্তার চিকিৎসা দিবেন।

হাই রিস্ক প্রেগনেন্সি মানেই যে গর্ভস্থ বাচ্চা বা মায়ের জীবন নাশের ঝুঁকি আছে, এমনটা ভেবে আতংকিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। এর মানে এই যে কোনো মেডিকেল কন্ডিশন বা অন্য কোনো কারণে গর্ভকালীন জটিলতা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে, তাই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধায়নে থাকতে হবে। অনেক হাই রিস্ক প্রেগনেন্সি-ই কোনো প্রকার জটিলতা ছাড়াই শেষ হয় এবং সুস্থ সবল শিশুর জন্ম হয়। এই ধরনের প্রেগনেন্সিতে মায়ের বাড়তি যত্নের প্রয়োজন হয়। তাই হবু মায়ের পাশাপাশি পরিবারের বাকি সদ্যস্যদেরও উচিত এ সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা এবং সময় থাকতেই সাবধান হয়ে যাওয়া।

ছবি- সাটারস্টক

Products in this article

সম্পর্কিত লেখা

ফ্যান্টম বা ফলস প্রেগনেন্সি | কনসিভ না করেও প্রেগনেন্সি টেস্ট পজিটিভ?
মা ও শিশু

ফ্যান্টম বা ফলস প্রেগনেন্সি | কনসিভ না করেও প্রেগনেন্সি টেস্ট পজিটিভ?

মেডিকেল সায়েন্সেও এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা অন্যদের কাছে আষাঢ়ে গল্প মনে হবে। সিউডোসায়েসিস (Pseudocyesis) অর্থাৎ ফ্যান্টম বা ফলস প্রেগনেন্সি এমনই একটি ঘটনা...

আর্লি প্রেগনেন্সিতে মিসক্যারেজ বা বার বার গর্ভপাত হওয়ার কারণ কী?
মা ও শিশু

আর্লি প্রেগনেন্সিতে মিসক্যারেজ বা বার বার গর্ভপাত হওয়ার কারণ কী?

কিছুদিন আগেও বাংলাদেশে গর্ভপাত ও শিশুর অকালমৃত্যু ছিল প্রায়ই স্বাভাবিক ঘটনা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে তা অনেকটা কমে এসেছে। তারপরও এখন গ্রামাঞ্চলে...

প্রেগনেন্সিতে ডায়াবেটিস গর্ভের সন্তানের উপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে?
মা ও শিশু

প্রেগনেন্সিতে ডায়াবেটিস গর্ভের সন্তানের উপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে?

প্রেগনেন্সিতে ডায়াবেটিস, শুনলেই মনে প্রথমে যেটা আসে এটি কি গর্ভাবস্থায় প্রসূতি মায়ের শরীরে ডায়াবেটিস ধরা পড়াকে বলা হচ্ছে? আসলে গর্ভকালীন সময়ে প্রসূত...

মৃত সন্তান প্রসবের ৯টি কারণ জানা আছে কি?
মা ও শিশু

মৃত সন্তান প্রসবের ৯টি কারণ জানা আছে কি?

মৃত সন্তান প্রসব করা বলতে প্রসবের পূর্বে গর্ভেই ভ্রূণের মৃত্যু হওয়াকে বুঝায়। এতে প্রসব হওয়া সন্তানের মধ্যে প্রাণের কোন চিহ্নই থাকে না। এটি গর্ভস্রাব এ...

আরও পড়ুন

একটোপিক প্রেগনেন্সি বা জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণ-একটি জরুরী অবস্থা
মা ও শিশু

একটোপিক প্রেগনেন্সি বা জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণ-একটি জরুরী অবস্থা

গর্ভধারণের সঠিক স্থান হচ্ছে জরায়ু। এর বাইরে যে কোন স্থানে গর্ভধারণ হলে তাকে একটোপিক প্রেগনেন্সি বলা হয়। সাধারনত এই প্রেগনেন্সি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ডিম্ব...

গর্ভাবস্থায় মায়ের ৮টি বিপদ চিহ্ন নিয়ে জানা আছে তো?
মা ও শিশু

গর্ভাবস্থায় মায়ের ৮টি বিপদ চিহ্ন নিয়ে জানা আছে তো?

মায়েরা স্বাভাবিকভাবেই চান সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থায় সন্তান জন্ম দিতে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় জটিলতা দেখা দিতে পারে যা মা ও গর্ভস্থ...

হাই হিলের ক্ষতিকর দিক
ফ্যাশন

হাই হিলের ক্ষতিকর দিক

হাই হিল ফ্যাশান সচেতন নারীদের প্রাত্যহিক জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই কথা অনস্বীকার্য যে হাই হিল পরলে অনেক বেশি স্মার্ট এবং ট্রেণ্ডী দেখায়। তবে সত...

টুইন প্রেগনেন্সি | মাতৃগর্ভে যমজ শিশু থাকলে কী কী জটিলতা দেখা দেয়?
মা ও শিশু

টুইন প্রেগনেন্সি | মাতৃগর্ভে যমজ শিশু থাকলে কী কী জটিলতা দেখা দেয়?

প্রসবের সময় অনেক মা এক সাথে দুই বা তার অধিক সন্তানের জন্ম দেন। যমজ শিশু গর্ভে ধারণ করার বিষয়টিকে চিকিৎসা শাস্ত্রে 'মাল্টিপল প্রেগনেন্সি' বা একের অধি...

ব্রেস্টের ক্যান্সার | কারণ প্রকারভেদ এবং নির্ণয়ের উপায় কি? (পর্ব ০২)
সুস্থতা

ব্রেস্টের ক্যান্সার | কারণ প্রকারভেদ এবং নির্ণয়ের উপায় কি? (পর্ব ০২)

ব্রেস্টের ক্যান্সার নিয়ে কত কত ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে সে সম্পর্কে আগের পর্বে আপনাদের জানিয়েছি। আজ জানাব ব্রেস্ট ক্যান্সার কী কারণে হয়ে থাকে, ব্রেস্ট ক্যা...

হবু মায়ের ত্বকের যত্নে কোন প্রোডাক্টগুলো এড়িয়ে চলা উচিত?
ত্বকের যত্ন

হবু মায়ের ত্বকের যত্নে কোন প্রোডাক্টগুলো এড়িয়ে চলা উচিত?

একজন নারী যখন জানতে পারেন তিনি সন্তান সম্ভবা, ঠিক তখন থেকেই তার পুরো দুনিয়াটা যেন বদলে যায়! পুরোটা প্রেগনেন্সি জুড়েই অনাগত শিশুর যত্ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্...

…