প্রেগনেন্সিতে ডায়াবেটিস গর্ভের সন্তানের উপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে?

ফারিহা সুলতানা · Feb 15, 2024 · 1 min read

প্রেগনেন্সিতে ডায়াবেটিস গর্ভের সন্তানের উপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে?

প্রেগনেন্সিতে ডায়াবেটিস, শুনলেই মনে প্রথমে যেটা আসে এটি কি গর্ভাবস্থায় প্রসূতি মায়ের শরীরে ডায়াবেটিস ধরা পড়াকে বলা হচ্ছে? আসলে গর্ভকালীন সময়ে প্রসূতি মায়ের রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেড়ে যাওয়াকে বলা হয় প্রেগনেন্সি ডায়াবেটিস বা Gestational Diabetes Mellitus. গর্ভকালে নারীদের শারীরবৃত্তীয় ও হরমোনের পরিবর্তন দেখা দেয়। হরমোনের উচ্চমাত্রাসহ কিছু ঝুঁকির কারণে কিছু ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস হতে পারে। তবে ভয়ের কারণ নেই, সন্তান জন্মদানের পরপরই সাধারণত ঠিক হয়ে যায়। গর্ভাবস্থার যেকোনো ধাপেই এটি হতে পারে তবে ২য় বা ৩য় ট্রাইমেস্টার অর্থাৎ ৪র্থ বা ৯ম মাসের সময় এটি হওয়াটা বেশ কমন। চলুন জেনে নেওয়া যাক বিস্তারিত।

প্রেগনেন্সিতে ডায়াবেটিস কেন হয়?

এক কথায় বলতে গেলে, যখন প্রেগনেন্ট মায়ের শরীর গর্ভকালীন সময়ের বাড়তি চাহিদা অনুযায়ী ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না, তখন এই সমস্যাটি শুরু হয়। চলুন এর কারণগুলো একটু দেখে আসি-

১) গর্ভধারণের আগে মায়ের ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকলে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। মায়ের BMI যদি ৩০ র বেশি হয় তাহলে ঝুঁকি বাড়ে।

২) অতীতে কোনো সন্তান যদি ৪.৫ কেজি বা ১০ পাউন্ডের বেশি ওজন নিয়ে জন্মায় সেক্ষেত্রে প্রেগনেন্সি ডায়াবেটিস এর ঝুঁকি বাড়ে।

প্রেগনেন্সিতে ডায়াবেটিস

৩) পরিবারের কারো ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকলে এই ঝুঁকি আরো বেড়ে যায়।

৪) কায়িক শ্রমের ঘাটতির জন্যও এটি হতে পারে।

৫) বয়স বেশি হয়ে গেলে, পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম বা PCOS থাকলেও এটি হওয়ার রিস্ক থাকে।

৬) প্রথম প্রেগনেন্সিতে ডায়াবেটিস হলে দ্বিতীয় গর্ভধারণেও এই ঝুঁকি থেকে যায়।

৭) থাইরয়েডের সমস্যা, হাইপারটেনশন, হাই কোলেস্টেরল এগুলো থাকলেও ঝুঁকি বাড়ে।

দক্ষিণ এশীয়, কৃষ্ণাঙ্গ, আফ্রিকান-ক্যারিবিয়ান বা মধ্যপ্রাচ্যের অধিবাসীদের মধ্যে ঝুঁকি বেশি থাকে।

লক্ষণ

এই ক্ষেত্রে সাধারণত বিশেষ লক্ষণ দেখা যায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি রুটিন চেকআপের সময় ধরা পড়ে। তবে কারো ক্ষেত্রে যদি রক্তে চিনির মাত্রা অনেক বেড়ে যায়, তবে সেক্ষেত্রে কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যেমন-

  • ঘন ঘন পিপাসা লাগা
  • ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ আসা
  • মুখ শুকিয়ে যাওয়া
  • ক্লান্ত বোধ করা
  • হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া
  • ক্ষুধা বেশি লাগা

তবে এই লক্ষণগুলো থাকা মানেই যে গর্ভবতী মায়ের ডায়াবেটিস আছে এমনটা নয়। অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রেগনেন্সিতেও এই লক্ষণগুলো দেখা যেতে পারে। তবে আপনার মধ্যে যদি এরকম কোনো লক্ষণ থাকে এবং সেটি নিয়ে আপনি যদি চিন্তিতবোধ করে, তাহলে দেরি না করে ডাক্তারের পরামর্শ নিন!

গর্ভের সন্তানের উপর কী ধরনের প্রভাব পরে?

অনেক ক্ষেত্রেই প্রেগনেন্সি ডায়াবেটিস থাকলেও গর্ভকাল অনেকটাই স্বাভাবিক থাকে এবং গর্ভের সন্তানও সুস্থভাবেই জন্ম নেয়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সন্তান ও মায়ের জটিলতা দেখা দিতে পারে, যেমন-

১) সন্তানের আকার স্বাভাবিকের চেয়ে বড় হওয়া। এতে করে প্রসবের সময় বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয়। ফলে কৃত্রিমভাবে ওষুধ দিয়ে বা সিজারিয়ান পদ্ধতিতে সন্তান প্রসব করানো লাগে।

২) ৩৭ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই সন্তান প্রসব হওয়া, একে প্রিম্যাচিউর লেবার বলে।

৩) অ্যামনিওটিক ফ্লুইডের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে, ফলে সময়েই আগেই প্রসব হয়ে যেতে পারে।

৪) গর্ভাবস্থায় ব্লাড প্রেশার ওঠানামা করতে পারে।

৫) জন্মের পর শিশুর শরীরে সুগারের মাত্রা কমে যেতে পারে বা অনেক ক্ষেত্রে ত্বক ও চোখের সাদা অংশ হলদেটে হয়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে শিশুকে অবশ্যই হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া প্রয়োজন।

৬) মৃত সন্তান প্রসব হতে পারে, যদিও এইটি খুবই বিরল।

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিশ্চিত হওয়ার উপায়

সাধারণত গর্ভাবস্থায় ৮ম থেকে ১২তম সপ্তাহে গর্ভবতী মায়ের প্রথম চেক আপের সময় তাকে কিছু রুটিন প্রশ্ন করা হয়, যার মাধ্যমে প্রেগনেন্সি ডায়াবেটিস এর ঝুঁকি আছে কিনা সেটি নিরূপণ করা হয়। যদি কারো ক্ষেত্রে এক বা একাধিক ঝুঁকি মিলে যায় সেক্ষেত্রে তাকে একটি স্ক্রিনিং করতে দেওয়া হয়, যেটি মাত্র ২ ঘন্টায় সম্পন্ন করা যায়। এর থেকেই নিশ্চিত হওয়া যায় প্রেগনেন্সি ডায়াবেটিস এর অস্তিত্ব সম্পর্কে।

এই স্ক্রিনিং টেস্টের নাম ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট বা OGTT. এই টেস্ট মূলত গর্ভাবস্থায় ২৪তম থেকে ২৮তম সপ্তাহে করা হয়। তবে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে যদি ডাক্তারের মনে হয় গর্ভবতী মায়ের মধ্যে প্রেগনেন্সি ডায়বেটিসের ঝুঁকি আছে, তাহলে এইটি তিনি আগেই করতে পরামর্শ দেন।

চিকিৎসা

চিকিৎসা

মূলত জটিলতা কমানোর জন্য এই সময় ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন। বাসায় রক্তের গ্লুকোজ মাপার যন্ত্র বা গ্লুকোমিটার থাকলে এটি সহজেই মাপা যায়। খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ ও শরীরকে সচল রাখলে খুব সহজেই ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবে এরপরেও যদি নিয়ন্ত্রণে না আসে তাহলে অবশ্যই ওষুধের প্রয়োজন পড়বে এবং ওষুধটি হতে পারে ট্যাবলেট বা ইনসুলিন ইনজেকশন।

প্রেগনেন্সিতে ডায়াবেটিস বেশ কমন, একটু সচেতন হলেই অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আর যেহেতু এর চিকিৎসা আছে, তাই দুশ্চিন্তা না করে যতোদূর সম্ভব খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনকে নিয়ন্ত্রণ করে একে বশে রাখাতেই মায়ের ও সন্তানের উভয়ের জন্যই মঙ্গল। ভালো থাকবেন, শুভ কামনা প্রতিটি হবু মায়ের জন্য।

ছবি- সাটারস্টক

সম্পর্কিত লেখা

ডায়াবেটিস কী, কত ধরনের হয়ে থাকে এবং এর চিকিৎসা কী হতে পারে?
সুস্থতা

ডায়াবেটিস কী, কত ধরনের হয়ে থাকে এবং এর চিকিৎসা কী হতে পারে?

এখনকার সময়ে ডায়াবেটিস খুব কমন একটি রোগ। আমাদের দেশে এই রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। শিশু থেকে বৃদ্ধ যে কোনো বয়সের মানুষেরই এই রোগ হতে পারে। এ...

ডায়াবেটিস রোগীদের কোন ফল খেতে বাধা নেই?
সুস্থতা

ডায়াবেটিস রোগীদের কোন ফল খেতে বাধা নেই?

ডায়াবেটিস এখন বহুল পরিচিত একটি রোগ। আপাতদৃষ্টিতে খুব ক্ষতিকর কোনও অসুখ বলে মনে না হলেও যেহেতু এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী অসুখ, যা কখনই নিরাময়যোগ্য নয়, তাই...

ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগ | টাইপ লক্ষণ কারণ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা কী?
সুস্থতা

ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগ | টাইপ লক্ষণ কারণ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা কী?

ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগ অথবা ডায়াবেটিস মেলিটাস (ইংরেজিতে Diabetes mellitus) একটি হরমোন সংশ্লিষ্ট রোগ। দেহে অগ্ন্যাশয় যদি যথেষ্ট ইনসুলিন তৈরি করতে...

মৃত সন্তান প্রসবের ৯টি কারণ জানা আছে কি?
মা ও শিশু

মৃত সন্তান প্রসবের ৯টি কারণ জানা আছে কি?

মৃত সন্তান প্রসব করা বলতে প্রসবের পূর্বে গর্ভেই ভ্রূণের মৃত্যু হওয়াকে বুঝায়। এতে প্রসব হওয়া সন্তানের মধ্যে প্রাণের কোন চিহ্নই থাকে না। এটি গর্ভস্রাব এ...

আরও পড়ুন

আপনার সন্তান কি ডায়াবেটিস এ আক্রান্ত?
মা ও শিশু

আপনার সন্তান কি ডায়াবেটিস এ আক্রান্ত?

এখনকার দিনে ডায়াবেটিস খুব সাধারণ রোগ হয়ে গেছে। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, খাওয়া দাওয়ায় অনিয়ম, অপর্যাপ্ত কায়িক পরিশ্রম আর অসময়ের ঘুমের অভ্যাস, এসব কারণেই দি...

হাই রিস্ক প্রেগনেন্সি | ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থায় হবু মায়ের প্রয়োজন একটু বাড়তি যত্ন!
মা ও শিশু

হাই রিস্ক প্রেগনেন্সি | ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থায় হবু মায়ের প্রয়োজন একটু বাড়তি যত্ন!

প্রেগনেন্সি মেয়েদের জীবনের খুব জটিল ও জরুরী সময়। সাধারণত সুস্থ, সবল, জটিলতাহীন প্রেগনেন্সি পিরিয়ড সকল হবু মায়ের কাম্য। একজন নারী যখন গর্ভধারণ করেন তখন...

প্রি ডায়াবেটিস এর লক্ষণ এবং ঝুঁকি কমানোর উপায় কী হতে পারে?
সুস্থতা

প্রি ডায়াবেটিস এর লক্ষণ এবং ঝুঁকি কমানোর উপায় কী হতে পারে?

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হবার পর সবাই বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করে, লাইফস্টাইলে নিয়ে আসে পরিবর্তন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ৮০ শতাংশ মানুষ জানেন না যে তারা প্রি ডায়...

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস | লক্ষণ, কারণ এবং চিকিৎসা কী?
মা ও শিশু

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস | লক্ষণ, কারণ এবং চিকিৎসা কী?

একজন নারী মা হওয়ার শুরু থেকে সন্তান জন্ম দেয়া পর্যন্ত নানা জটিলতার মধ্য দিয়ে সময় পার করেন। যেমন রক্ত স্বল্পতা, ব্লিডিং, বমি, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস ইত্যা...

জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস এ খাদ্যাভ্যাস ও লাইফস্টাইল পরিবর্তন কতটা জরুরি?
মা ও শিশু

জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস এ খাদ্যাভ্যাস ও লাইফস্টাইল পরিবর্তন কতটা জরুরি?

সাধারণত ডায়াবেটিস বলতে আমরা বুঝি রক্তে গ্লুকোজের আধিক্য। গর্ভকালীন সময়ে মায়ের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলে তাকে জেস্টেশনাল ডায়া...

বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস
সুস্থতা

বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস

আজ ১৪ই নভেম্বর, বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। বাংলাদেশ ডায়াবেটিস সমিতির অনুরোধে, বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তাবে, জাতিসংঘের সম্মতিতে গত ৬ বছর ধরে সারাবিশ্বে ১৪ই নভ...

…