গুলেন ব্যারি সিনড্রোম বা জিবিএস এর লক্ষণ ও চিকিৎসা

মাহমুদা রোজী · May 16, 2022 · 1 min read

গুলেন ব্যারি সিনড্রোম বা জিবিএস এর লক্ষণ ও চিকিৎসা

গুলেন ব্যারি সিনড্রোম বা সংক্ষেপে জিবিএস হচ্ছে এমন একটি মারাত্বক রোগ যা মাংশপেশীকে দুর্বল করে ধীরে ধীরে শরীরের শক্তি কমিয়ে দেয়। একপর্যায়ে নড়াচড়ার সামর্থ্যও হারিয়ে যেতে পারে। যেকোনো বয়সেই জিবিএস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু ৩০-৩৫ বছর বয়সী এবং নারীদের তুলনায় পুরুষদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। চলুন, ফিজিওথেরাপি কনসালট্যান্ট অ্যান্ড জেরোন্টলজিস্ট এর কাছ থেকে জেনে নেই এই রোগ নিয়ে বিস্তারিত।

এই রোগের কারণগুলো কী কী?

গুলেন ব্যারি সিনড্রোম নামটি অনেকের কাছে অপরিচিত হলেও রোগটির প্রাদুর্ভাব একেবারে কম নয়। সাধারণত প্রায় ৮০ শতাংশ রোগী সম্পূর্ণ সেরে ওঠে, ৫ থেকে ১০ শতাংশ রোগীর কিছু না কিছু শারীরিক দুর্বলতা স্থায়ীভাবে থেকে যায়। সঠিক কারণ এখন পর্যন্ত জানা যায়নি, তবে বেশ কয়েকটি ফ্যাক্টর এর সাথে জড়িত। যেমন-

  • ভাইরাল ইনফেকশন, যেমন- এইডস, হার্পিস সিমপ্লেক্স, ম্যাগনিওক্লিওসিস ইত্যাদি
  • ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন
  • অনেক সময় সার্জারীর পরও এই রোগ হতে পারে
  • ডায়রিয়া রোগী বা ইনফ্লুয়েঞ্জাতে আক্রান্ত রোগীরা পরবর্তী পর্যায়ে জিবিএসে আক্রান্ত হতে পারে

গুলেন ব্যারি সিনড্রোম বা জিবিএস এর লক্ষণ

১। খুব দ্রুত রোগীর অবস্থা খারাপ হতে থাকে। ২। কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েকদিনের মাঝে রোগীর হাত ও পা অবশ হয়ে যায়। ৩। সাধারণত পা থেকে দুর্বলতা শুরু হয় এবং দুই পা একসাথে আক্রান্ত হয়। ৪। ধীরে ধীরে পুরো পা থেকে কোমর পর্যন্ত অবশ হয়ে যায় এবং হাতও অবশ হতে শুরু করে। ৫। মাংসপেশীতে ব্যথা থাকে। ৬। স্বাভাবিক নড়াচড়ার সামর্থ্য হারিয়ে যায়। ৭। কিছু ক্ষেত্রে রোগীর শ্বাসতন্ত্রের মাংসপেশী প্যারালাইজড হয়ে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, অনেক সময় এসব রোগী মারা যায়।

চিকিৎসা

জিবিএস রোগটিকে খুব সহজে ডায়াগনোসিস করা যায় না। কারণ এই রোগের উপসর্গ অন্য নিওরোলজিক্যাল রোগের সাথে মিলে যায়। চিকিৎসক রোগের হিস্ট্রি নেন এবং ফিজিক্যাল এক্সামিনেশন করেন। তারপর কারও কারও ক্ষেত্রে স্পাইনাল ট্যাপ (লাম্বার পাংচার), ইলেক্ট্রো মায়োগ্রাফি, নার্ভ কনডাকশন স্টাডিজ এর মাধ্যমে রোগকে ডায়াগনোসিস করেন। বিভিন্ন ধরনের রিসার্চ থেকে জানা যায়, রোগীরা ছয় থেকে বারো মাসের মধ্যে সুস্থ হয়ে যান। কারও কারও ক্ষেত্রে এই রোগ থেকে পুরোপুরি সুস্থ হতে তিন বছরের মতো সময় লাগে। তবে এদের সংখ্যা খুবই কম। হাসপাতালে রোগীর অবস্থা ও ধরন দেখে চিকিৎসক দুই ধরনের চিকিৎসা চালু করেন।

  • প্লাজমা এক্সচেঞ্জ
  • ইমিউনোগ্লোবিউলিন থেরাপি

অনেক সময় দুই ধরনের চিকিৎসা-ই চিকিৎসক চালু রাখেন, রোগীর অবস্থা অনুযায়ী তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এছাড়াও ব্যথা কমানোর জন্য, রক্ত জমাট না বাঁধার জন্যেও রোগীর মেডিকেশন চালু থাকে।

ফিজিওথেরাপি

এই সময়ে রোগীর ফিজিওথেরাপি চিকিৎসাও শুরু করে দেওয়া হয়। ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে হাতের, পায়ের মুভমেন্ট সচল রাখার জন্য বিভিন্ন এক্সারসাইজ করানো হয়। এতে করে মাংসপেশীর ক্ষয়, শুকিয়ে যাওয়া প্রতিরোধ করা হয়।

১) রোগী যখন ধীরে ধীরে সুস্থ হতে শুরু করেন, তখন ওয়েট বেয়ারিং এর মতো এক্সারসাইজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

২) রোগীর অবস্থার উন্নতির উপর নির্ভর করে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। বিভিন্ন ধরনের এক্সারসাইজের মাধ্যমে হাতে-পায়ের মাংসপেশীকে সবল করে পুনরায় আগের অবস্থানে আনা হয়।

৩) অনেক ধরনের এক্সারসাইজের সমন্বয়ে রোগীর জন্য গাইড লাইন বানানো হয়। কিছুদিন পর পর এই গাইড লাইনে নতুন এক্সারসাইজ সংযোজন ও বিয়োজনের মাধ্যমে আপডেট করা হয়। এই সময়ে একজন অভিজ্ঞ ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিতে হয়।

৪) সাধারণত জিবিএস রোগীরা কয়েক মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। কারও কারও ক্ষেত্রে হয়তো বছর লেগে যায়। এই সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য রোগের প্রকোপ, রোগীর শারীরিক ফিটনেস, ভালো হয়ে ওঠার চেষ্টা, মানসিক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

গুলেন ব্যারি সিনড্রোম এ আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা

এই রোগের প্রথম উপসর্গ দেখা দেওয়ার পরে দুই সপ্তাহের মধ্যেই অবস্থা খারাপের দিকে চলে যায়। অনেকেই বলেছেন, সপ্তাহ দুয়েক আগে হালকা ঠাণ্ডা লেগেছিল, ভালোও হয়ে গিয়েছে। তারপর হঠাৎ একদিন লক্ষ্য করলেন তার হাত-পা অবশ হয়ে আসছে এবং সেটা দ্রুত পুরো দেহে ছড়িয়ে যাচ্ছে। এই ছিল তাদের অভিজ্ঞতা। অনেকের ক্ষেত্রে চার সপ্তাহ অবধি অবস্থা খারাপ হতে থাকে। তারপর থেকে রোগের প্রকোপ কমে আসে এবং তারা ভালো হতে শুরু করেন। কারও কারও ক্ষেত্রে এই রোগ থেকে পুরোপুরি সুস্থ হতে তিন বছরের মতো সময় লাগে।

আজ আমরা গুলেন ব্যারি সিনড্রোম নিয়ে অনেক কিছু জানলাম। রোগীর শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা কমে এলে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা শুরু করে দিতে হবে। একমাত্র সঠিক ফিজিওথেরাপির মাধ্যমেই গুলেন ব্যারি সিনড্রোম এ আক্রান্ত রোগীকে তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। সচেতন হোন, সুস্থ থাকুন।

  ছবি- সাটারস্টক

Products in this article

সম্পর্কিত লেখা

করোনা রোগীর সেবা | পরিচর্যাকারীর কোন বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখা উচিত?
সুস্থতা

করোনা রোগীর সেবা | পরিচর্যাকারীর কোন বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখা উচিত?

সম্প্রতি আবিষ্কৃত নভেল কভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস নিয়ে সারা পৃথিবী তোলপাড়। এর আগে একই রকমের সার্স, মার্স রোগ দেখা দিলেও তা করোনার মতো এত ব্যাপ্তি পায় নি।...

করোনাতে আক্রান্ত রোগীর করণীয় কী?
সুস্থতা

করোনাতে আক্রান্ত রোগীর করণীয় কী?

করোনা নিয়ে আমরা সবাই আতঙ্কিত। বহিঃবিশ্বের ন্যায় এখনো যদিও আমাদের দেশে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ব্যাপক আকার ধারন করে নি, তবুও যে ২/৪ জন আক্রান্ত হয়েছে...

থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে বিয়ের আগে হবু দম্পতির টেস্ট করানো কতটা জরুরি?
সুস্থতা

থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে বিয়ের আগে হবু দম্পতির টেস্ট করানো কতটা জরুরি?

রাহেলা জামান বেশ কয়েক দিন ধরে লক্ষ্য করছেন যে, ইদানিং থ্যালাসেমিয়া নিয়ে বেশ কথা হয়। রাহেলা থ্যালাসেমিয়া সমস্যা সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানেন না। শুধু জ...

ফেসিয়াল নার্ভ প্যারালাইসিস বা হঠাৎ মুখ বেঁকে যাওয়ার কারণ ও চিকিৎসা
সুস্থতা

ফেসিয়াল নার্ভ প্যারালাইসিস বা হঠাৎ মুখ বেঁকে যাওয়ার কারণ ও চিকিৎসা

হঠাৎ করে কোনো এক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন আপনার মুখ একদিকে বেঁকে গেছে! কুলি করতে গেলে পানি ঠোঁট বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে, চোখ বন্ধ করতে পারছেন না! কী ভয়ংকর অন...

আরও পড়ুন

সিজোফ্রেনিয়া কী এবং এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের আচরণ কেমন হয়?
সুস্থতা

সিজোফ্রেনিয়া কী এবং এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের আচরণ কেমন হয়?

ইদানিং সজল তার বাড়ির কারও সাথে বেশি কথা বলে না। এমনকি কেউ তার খাবার বেড়ে দিলে সেটাও সে খায় না। তার ধারণা অন্যের দেওয়া খাবারে বিষ মেশানো আছে। আবার, রাস...

কাঁধ নাড়াতে অসহ্য ব্যথা! ফ্রোজেন শোল্ডার রোগে ভুগছেন না তো?
সুস্থতা

কাঁধ নাড়াতে অসহ্য ব্যথা! ফ্রোজেন শোল্ডার রোগে ভুগছেন না তো?

রওশন আরা বেশ কিছুদিন ধরে কাঁধের ব্যথায় ভুগছেন। ব্যথার মেডিসিন খেয়েছেন, এতে ব্যথা কিছুটা কমে বটে কিন্তু পুরোপুরি সেরে যায় না। হাত নাড়াতে গেলেই ব্যথা চর...

প্রি মেনসট্রুয়াল সিনড্রোম | ঋতুস্রাবে ইমোশনাল সমস্যাটি কেন হয়?
সুস্থতা

প্রি মেনসট্রুয়াল সিনড্রোম | ঋতুস্রাবে ইমোশনাল সমস্যাটি কেন হয়?

প্রি মেনসট্রুয়াল সিনড্রোম বা PMS-কে সহজভাবে বলা যায় কিছু ইমোশনাল সমস্যার সমষ্টি যেখানে শারীরিক লক্ষণ হিসেবে দেখা দিতে পারে আবার নাও দিতে পারে। প্রি...

সচেতনতাই স্বস্তি; অসুখ থেকে মুক্তি
সুস্থতা

সচেতনতাই স্বস্তি; অসুখ থেকে মুক্তি

পৃথিবীর বয়স যত বাড়ছে, নিত্য নতুন অসুখও যেন বেড়েই চলেছে। তার উপরে আছে দুশ্চিন্তা । কোন ডাক্তার ভালো হবে। কে সঠিক ভাবে আমাকে বুঝতে পারবে। অনেকে শুধু...

স্ট্রোকের লক্ষণ ও প্রতিরোধ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ জানা আছে কি?
সুস্থতা

স্ট্রোকের লক্ষণ ও প্রতিরোধ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ জানা আছে কি?

বর্তমান সময়ে তরুণ বয়সে স্ট্রোকের সংখ্যা আশংকাজনকভাবে বেড়ে গেছে। মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলে ব্যাঘাত ঘটলে বা কখনো রক্তনালি ফেটে গিয়ে রক্ত জমাট বেঁধে গেলে মস্...

পোস্ট কোভিড সিনড্রোম | কোভিড নেগেটিভ হয়েও শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন?
সুস্থতা

পোস্ট কোভিড সিনড্রোম | কোভিড নেগেটিভ হয়েও শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন?

মাস কয়েক আগেই খালেক সাহেব সপরিবারে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়েছিলেন, থমকে গিয়েছিল তাদের জীবন। পরিবারের বাকি সবাই পরিত্রাণ পেলেও খালেক সাহেবের বাবা রেহাই পান...

…