ব্লাড ডোনেশন | কারা রক্তদান করতে পারে এবং এর উপকারিতা জানা আছে কি?

ডাঃ মারুফা আক্তার · Jun 15, 2019 · 1 min read

ব্লাড ডোনেশন | কারা রক্তদান করতে পারে এবং এর উপকারিতা জানা আছে কি?

কোন মানুষের রক্তের প্রয়োজন হলে তা অন্য কোন মানুষ হতেই সংগ্রহ করতে হয়। কারণ এখন অব্দি চিকিৎসাবিজ্ঞানে রক্তের কোন বিকল্প বা কৃত্তিম রক্ত তৈরি করার পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয় নি। ব্লাড ডোনেশন জগতের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং নিঃস্বার্থ উপহার। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের তথ্য মতে, গড়ে প্রতি বছর ৮ লাখ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়, যার মধ্যে প্রায় ৭ লাখ ব্যাগ রক্ত জোগাড় করা সম্ভব হয়। আর বাকি ১ লাখ ব্যাগ পেশাদার রক্তদাতাদের থেকে সংগ্রহ করা হয়, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনিরাপদ সঞ্চালনের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। তাই, রক্তদানের মতো এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে আমাদের আমাদের সচেতন হওয়া উচিত। চলুন জেনে নেই, রক্ত কাদের প্রয়োজন হয়, কারা দিতে পারে, কারা পারে না ও রক্তদানের উপকারিতা সম্পর্কে!

ব্লাড ডোনেশন নিয়ে যত কথা

রক্ত কাদের প্রয়োজন হয়?

মানবদেহে নানাবিধ কারণে রক্তের প্রয়োজন হতে পারে। রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি-এর তথ্য অনুযায়ী রোগীর ধরন অনুযায়ী প্রতি বছর বিশ্বে ১০ কোটি ৮০ লক্ষ  (১০৮ মিলিয়ন) ব্যাগ দানকৃত রক্ত সংগ্রহ করা হয়। যার মধ্যে ৩১% সংগ্রহ করা হয় রেড ক্রিসেন্ট ও রেড ক্রস-এর সেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে। তাঁদের হতে প্রাপ্ত তথ্য মতে সংগ্রহকৃত রক্ত নিম্নোলিখিত খাতে যায়-

১) ক্যান্সারও বিভিন্ন রক্তরোগে আক্রান্ত রোগীর জন্য (৩৪%)

ক্যান্সার রোগীর জন্য ব্লাড ডোনেশন - shajgoj.com

২) বিভিন্ন ধরনের অ্যানিমিয়া (anemia) আক্রান্ত রোগীর জন্য (১৯%)

৩) ওপেন হার্ট সার্জারি-সহ বিভিন্ন ধরনের অপারেশন ও আগুনে পুড়ে যাওয়া রোগীর জন্য  (১৮%)

 হার্ট সার্জারিতে রক্ত প্রয়োজন - shajgoj.com

৪) অন্যান্য শারীরিক সমস্যা যেমন হৃদরোগ, কিডনীরোগ-এর জন্য  (১৩%)

৫) অর্থোপেডিক রোগীর জন্য  (১২%)

৬) স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীরোগের রোগীর-গর্ভবতী মায়েদের, সন্তান জন্মদানের পর মা ও সন্তানের জন্য  (৪%)

কারা রক্ত দিতে পারবে?

ব্লাড ডোনেশন-এর প্রথম শর্ত হচ্ছে দাতাকে সুস্থ থাকতে হবে। একজন সুস্থ ব্যক্তির যে গুণ বা শারীরিক অবস্থা থাকলে রক্তদান করতে পারবেন-

১. বয়স

১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সী নারী ও পুরুষ রক্তদান করতে পারবে।

২. ওজন

নারীর সর্বনিম্ন ওজন ৪৫ কেজি ও পুরুষের সর্বনিম্ন ওজন ৫০ কেজি হতে হবে।

৩. হিমোগ্লোবিন-এর পরিমাণ

ব্লাড ডোনেশন এ হিমোগ্লোবিন স্বাভাবিক থাকতে হয় - shajgoj.com প্রতি ডেসিলিটার রক্তে হিমোগ্লোবিন-এর পরিমাণ - নারীর ১৩ গ্রাম ও পুরুষের ১৪ গ্রাম হতে হবে।

৪.  শরীরের তাপমাত্রা

রক্তদাতার শরীরের তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড/৯৮ ডিগ্রী ফারেনহাইট হতে হবে।

৫. রক্তচাপ

রক্তদাতার রক্তচাপ, ডায়াস্টোলিক ৭০-১০০ মিলিমিটার পারদ এবং সিস্টোলিক ১১০-১৬০ মিলিমিটার পারদ হতে হবে।

৬. নাড়ির গড় গতি

রক্তদাতার নাড়ির গড় গতি প্রতি মিনিটে ৭০-৯০ বিট হতে হবে। যেকোন সুস্থ ব্যক্তির  উপরোল্লেখিত শারীরিক গুণাবলি থাকলে ৪ মাস অন্তর অন্তর রক্ত দিতে পারবেন।

কারা রক্ত দিতে পারবে না?

মন চাইলো আর ব্লাড ডোনেট করতে পারবেন, তা ভুলে যান। অনেক ক্ষেত্রেই পরে নিজের শরীরের ক্ষতি হয়। তাই চলুন দেখি কারা রক্ত দিতে পারবে না।  এইডস রোগী ব্লাড ডোনেশন করতে পারে না - shajgoj.com

১) এইডস, হেপাটাইটিস বি ও সি সহ যেকোন ভাইরাসজনিত রোগ, ম্যালেরিয়া, সিফিলিস এবং ক্যান্সার আক্রান্ত হলে

২) যক্ষারোগে আক্রান্ত হবার ২ বছর এবং গুটি বসন্ত রোগে আক্রান্ত হবার ১ বছরের মধ্যে রক্ত দান করা যাবে না

৩) বহুমূত্র (ডায়বেটিস) রোগী, শ্বাসরোগ ও চর্মরোগী রক্তদান করতে পারবেন না

এছাড়া অ্যানেস্থেশিয়া গ্রহণ বা বড় কোন অপারেশন-এর পর রক্ত দান করা যাবে না।

ব্লাড ডোনেশন-এর পর করণীয় কী?

১. স্যালাইন গ্রহণ

ব্লাড ডোনেশন-এর পর স্যালাইন গ্রহণ - shajgoj.com

রক্ত দেবার পর শরীর কিছুটা দুর্বল হয়ে যেতে পারে তখন স্বাভাবিকভাবেই মাথা ঘুরাতে পারে। স্বাভাবিক হওয়া না পর্যন্ত বিশ্রাম নেয়া উচিত। তবে রক্তদানের পর, রক্তদাতা ঘামতে থাকেন এবং রক্তদাতার অস্থিরতা হয়। এক্ষেত্রে তাকে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী স্যালাইন খাওয়ানো যেতে পারে।

২. খাবার গ্রহণ

ব্লাড ডোনেশন-এর পর খাবার - shajgoj.com

রক্ত দেবার পর দেহে লোহিত রক্ত কণিকা কমে যায়, যা স্বাভাবিক হয়ে ৩০-৪৫ দিন সময় লাগে। লোহিত কণিকার পাশাপাশি দেহে ২০০-৩০০ গ্রাম আয়রন ঘাটতি হয় এবং এই ঘাটতি পূরণের জন্য আয়রন ও প্রোটিনযুক্ত খাবার গ্রহণ করতে হবে। রক্তদাতার সুস্থতাও জরুরী।

ব্লাড ডোনেশন-এর উপকারিতা

রক্তদানের মাধ্যমে একজন মানুষের জীবন বাঁচে, এর চেয়ে বড় মানসিক শান্তি আর হতে পারে না। পাশাপাশি রক্তদাতার আরও কিছু উপকারিতার কথা বলেন চিকিৎসকেরা। চলুন জেনে নেই সেটাই- ব্লাড ডোনেশনের পর রক্তে কোলেস্টরেলের পরিমাণ কমে যায় - shajgoj.com

১) নিয়মিত রক্ত দানে রক্তে কোলেস্টরেল-এর পরিমাণ কমে যায়, ফলে হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাক-এর ঝুঁকি কমে।

২) নিয়মিত ( ৪ মাস অন্তর অন্তর) রক্তদানে দেহে নতুন লোহিত রক্ত কণিকা তৈরির হার বৃদ্ধি পায়।

৩) অস্থিমজ্জা সক্রিয় থাকে, দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং দ্রুত রক্তস্বল্পতা পূরণ হয়।

৪) বিনা খরচে শরীরের চেক-আপ হয়ে যায় এবং শরীরে হেপাটাইটিস-বি,সি, জন্ডিস, ম্যালেরিয়া, সিফিলিস এবং এইডস-এর মতো বড় কোন রোগ আছে কি না, সেটি জানা যায়।

৫) রক্তদানের মাধ্যমে যে ক্যালরি খরচ হয়, তার ক্ষয়পূরণ ওজন কমাতে ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে সহায়ক।

প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী যেই বিপুল পরিমাণ রক্তের চাহিদা থাকে , তার জোগান দিতে ১০ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষ রক্তদান করেন প্রতি বছর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উপাত্ত অনুযায়ী উন্নত বিশ্বে স্বেচ্ছা রক্তদানের হার প্রতি ১০০ জনে ৪ জন হলেও,  তা উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশে প্রতি এক হাজারে ৪ জনেরও কম। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুয়ায়ী, জেমস হ্যারিসন নামে এক অস্ট্রেলিয় নাগরিক  ১১৭৩ বার রক্ত দান করে বিশ্ব রেকর্ড করেন।রক্তদানে বয়সসীমা নির্ধারিত হওয়ায় ৮১ বছর বয়সী জেমস ১১ মে ২০১৮ সালে সর্বশেষ রক্ত দান করেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্য ২০২০ সালের মধ্যে স্বেচ্ছায় রক্তদানের মাধ্যমে চাহিদার শতভাগ রক্তের সরবরাহ নিশ্চিত করা। এই লক্ষ্যে যারা প্রতিবছর স্বেচ্ছায় রক্তদান করেন, তাঁদের সম্মানার্থে প্রতি বছর ১৪ জুন বিশ্ব রক্তদাতা দিবস পালন করা হয়। তো ব্লাড ডোনেট করুন, অন্যের জীবন বাঁচান ও নিজে সুস্থ থাকুন।

ছবি- সংগৃহীত: সাজগোজ

সম্পর্কিত লেখা

রক্তের বিভিন্ন গ্রুপ ও তাদের প্রয়োজনীয়তা
সুস্থতা

রক্তের বিভিন্ন গ্রুপ ও তাদের প্রয়োজনীয়তা

রক্তের গ্রুপিং জানার প্রয়োজনীয়তা যে কত বেশি তা নতুন করে বলার কিছু নেই। ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অফ ব্লাড ট্রান্সফিউশন অনুযায়ী ৩২ টি গ্রুপিং করা যায়।...

নাক দিয়ে রক্ত পড়া বা এপিস্ট্যাক্সিস এর কারণ এবং এর চিকিৎসা
সুস্থতা

নাক দিয়ে রক্ত পড়া বা এপিস্ট্যাক্সিস এর কারণ এবং এর চিকিৎসা

শরীরের অন্যতম অঙ্গ নাক। নাকের প্রধান কাজ শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করা। শ্বাস প্রশ্বাস সঠিকভাবে চলছে মানেই ব্যক্তি জীবিত আছেন। এই নাক দিয়ে যখন রক্ত পড়ে তখন...

হাই ব্লাড প্রেশার | হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধে ১০টি সহজ সমাধান
সুস্থতা

হাই ব্লাড প্রেশার | হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধে ১০টি সহজ সমাধান

হাই ব্লাড প্রেশার হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপ নামেও পরিচিত। এই কন্ডিশন তখনি সৃষ্টি হয় যখন আর্টারিতে রক্তের অনেক প্রেশার থাকে। একজন ব্যক্তির ব্লাড প্র...

ব্লাড ক্যান্সারের এই উপসর্গগুলো এড়িয়ে যাচ্ছেন না তো?
স্বাস্থ্য

ব্লাড ক্যান্সারের এই উপসর্গগুলো এড়িয়ে যাচ্ছেন না তো?

ক্যান্সার এক ঘাতক রোগের নাম। মানব দেহের অনেক রকম ক্যান্সারের মধ্যে ব্লাড ক্যান্সার অন্যতম। এটি হেমাটোলজিক্যাল ক্যান্সার নামেও পরিচিত। ব্লাড ক্যান্সারে...

আরও পড়ুন

করোনা রোগীর সেবা | পরিচর্যাকারীর কোন বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখা উচিত?
সুস্থতা

করোনা রোগীর সেবা | পরিচর্যাকারীর কোন বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখা উচিত?

সম্প্রতি আবিষ্কৃত নভেল কভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস নিয়ে সারা পৃথিবী তোলপাড়। এর আগে একই রকমের সার্স, মার্স রোগ দেখা দিলেও তা করোনার মতো এত ব্যাপ্তি পায় নি।...

ডায়াবেটিক রোগীর পায়ের যত্ন কীভাবে নেওয়া উচিত?
সুস্থতা

ডায়াবেটিক রোগীর পায়ের যত্ন কীভাবে নেওয়া উচিত?

আনিস আহমেদ নতুন এক জোড়া জুতা কিনেছেন। প্রথম দিন জুতা পায়ে অফিস করার পর থেকেই পায়ে ফোস্কা পড়েছে। তিনি ভাবলেন দিন কয়েকের মধ্যে সেরে যাবে। কিন্তু কয়েকদিন...

থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে বিয়ের আগে হবু দম্পতির টেস্ট করানো কতটা জরুরি?
সুস্থতা

থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে বিয়ের আগে হবু দম্পতির টেস্ট করানো কতটা জরুরি?

রাহেলা জামান বেশ কয়েক দিন ধরে লক্ষ্য করছেন যে, ইদানিং থ্যালাসেমিয়া নিয়ে বেশ কথা হয়। রাহেলা থ্যালাসেমিয়া সমস্যা সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানেন না। শুধু জ...

স্ট্রোকের লক্ষণ ও প্রতিরোধ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ জানা আছে কি?
সুস্থতা

স্ট্রোকের লক্ষণ ও প্রতিরোধ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ জানা আছে কি?

বর্তমান সময়ে তরুণ বয়সে স্ট্রোকের সংখ্যা আশংকাজনকভাবে বেড়ে গেছে। মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলে ব্যাঘাত ঘটলে বা কখনো রক্তনালি ফেটে গিয়ে রক্ত জমাট বেঁধে গেলে মস্...

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায় জানা আছে কি?
সুস্থতা

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায় জানা আছে কি?

হৃদরোগ এখন বিশ্বব্যাপী অকাল মৃত্যুর একটি বড় কারণ। হার্ট অ্যাটাক হয় সাধারণত হৃদপিন্ডে পর্যাপ্ত রক্ত চলাচল কমে গেলে বা বন্ধ হয়ে গেলে। অথবা রক্ত চলাচলের...

ঋতুস্রাব বা মাসিক | পিরিয়ড ফেজে সুস্থতায় ৭টি টিপস!
সুস্থতা

ঋতুস্রাব বা মাসিক | পিরিয়ড ফেজে সুস্থতায় ৭টি টিপস!

পিরিয়ড/ মাসিক/ মিনস/ ঋতুস্রাব/ মেন্সট্রুয়াল সাইকেল সৃষ্টিকর্তা কতৃক নির্ধারিত, নারী চরিত্রের প্রকৃতিপ্রদত্ত একটি নিয়ম। এই স্বাভাবিক বিষয়টিকে সমাজে ট্য...

…