মূত্রনালীর সংক্রমণ | ইউটিআই হওয়ার লক্ষণ, কারণ, চিকিৎসা ও প্রতিকার কী?

ডাঃ মারুফা আক্তার · Jun 09, 2019 · 1 min read

মূত্রনালীর সংক্রমণ | ইউটিআই হওয়ার লক্ষণ, কারণ, চিকিৎসা ও প্রতিকার কী?

প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া করছে? বারবার প্রস্রাব হচ্ছে? প্রস্রাবের বেগ ধরে রাখতে পারছেন না? আপনি যদি একজন মহিলা হয়ে থাকেন তাহলে এ ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হলে শতভাগ সম্ভাবনা আছে আপনি হয়ত মূত্রনালীর সংক্রমণ বা ইউটিআই (UTI) এ ভুগছেন। পুরুষরা এ সমস্যায় পড়েন না তা নয়, তবে মহিলাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটা বেশি। আর বিশ্বব্যাপী এ সমস্যা এখন মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। তাই এখনই সময় সচেতন হবার। সেই উদ্দেশ্যেই আজকের এই লেখা। আসুন জেনে নেই মূত্রনালীর সংক্রমণ বা ইউটিআই নিয়ে বিস্তারিত।

মূত্রনালীর সংক্রমণ বা ইউটিআই কী?

মূত্রনালীর সংক্রমণ বা ইউটিআই - shajgoj.com

মূত্রনালীর সংক্রমণ বা ইউটিআই হল মুত্রতন্ত্রের একটি সংক্রামক রোগ। আমাদের দেহ থেকে তরল বর্জ্য পদার্থ বের হওয়ার জন্য দেহে যে পদ্ধতি বা সিস্টেম রয়েছে সেটাকেই মুত্রতন্ত্র বা ইউরিনারি ট্র্যাক্ট (urinary tract) বলে। যদি কোন কারণে জীবাণু এই তন্ত্রে আঘাত হানে তাহলেই মুত্রতন্ত্রে ব্যাঘাত ঘটে আর আর এই অবস্থাকেই মূত্রতন্ত্রের সংক্রামক রোগ বা ইউটিআই হয়েছে বলা হয়। ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক বা ভাইরাস এরা সবাই এ রোগের জন্য দায়ী থাকলেও ব্যাকটেরিয়াই বেশীরভাগ ক্ষেত্রে এর জন্য দায়ী।

মূত্রনালীর সংক্রমণ বা ইউটিআই-এর লক্ষণ

মূত্রনালীর সংক্রমণ বা ইউটিআই এর লক্ষণ - shajgoj.com

মূত্রনালীর সংক্রমণ রোগের লক্ষণ রোগীর বয়স এবং লিঙ্গের উপর নির্ভর করে ভিন্ন রকম হতে পারে। তবে কিছু কমন লক্ষণ আছে যেমন-

১) ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ আসা, কিন্তু কোনবারই যথেষ্ট পরিমাণ প্রস্রাব হবে না।

২) প্রস্রাব করার সময় তীব্র ব্যথা এবং জ্বালাপোড়া অনুভব হবে।

৩) শরীর দূর্বল হওয়া, পিঠের নিচের দিকে বা তলপেটে প্রচন্ড ব্যথা অনুভূত হওয়া।

৪) ঘোলা ও দূর্গন্ধযুক্ত প্রস্রাব হওয়া বা কখনো কখনো প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়া।

৫) প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া ভাবের সাথে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসতে পারে।

৬) প্রস্রাব আটকে রাখতে না পারা।

৭) ছোটদের ক্ষেত্রে ডায়ারিয়া, জ্বর, খেতে না চাওয়া ইত্যাদি নানা উপসর্গ দেখা যায়।

ইউটিআই হওয়ার কারণ

মূত্রনালীর সংক্রমণ বা ইউটিআই হওয়ার কারণ - shajgoj.com

ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের মধ্যে এই সমস্যা অনেক বেশি দেখা যায়। কারণ মেয়েদের মূত্রনালী জন্মগতভাবে পুরুষদের তুলনায় অনেক ছোট এবং মলদ্বারের খুব কাছাকাছি। তাই ব্যাকটেরিয়া খুব সহজেই আক্রমণ করে এবং জীবাণু মূত্রথলি এবং কিডনির উপর প্রভাব বিস্তার করে।

১. মেনোপজ-এর পর ইস্ট্রোজেন-এর ক্ষরণ কমে যায়। ইস্ট্রোজেন মূত্রনালির সংক্রমণে বাধা দেয়। মেনোপজ-এর পর সেই সম্ভাবনা একদম থাকে না। ফলে সংক্রমণের সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায়।

২. অনেকক্ষণ যাবত প্রস্রাব আটকিয়ে রাখলে সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। টেলিভিশন দেখার সময়, বাসে ট্রেনে যাতায়াত করার সময় বা জরুরী মিটিং-এর সময় অনেকেই প্রস্রাব আটকিয়ে রাখেন যা একদমই উচিত নয়।

৩. যৌনসঙ্গীর ইউটিআই থাকলে শারীরিক মিলনের সময় অন্য সঙ্গীও সংক্রমিত হতে পারেন।

৪. পারসোনাল হাইজিন বা নিজস্ব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মেনে না চললে ইউটিআই হতে পারে।

৫. যদি কারো কিডনি অথবা মুত্রথলিতে পাথর থাকে তবে তা স্বাভাবিক মূত্রত্যাগে বাধা প্রদান করে। এর ফলেও ইনফেকশন হতে পারে।

৬. ডায়াবেটিস, প্রেগন্যান্সি বা অন্য কোন রোগে যদি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গিয়ে থাকে তাহলে ইউটিআই হতে পারে।

৭. অনেক সময় অপারেশনের আগে বা পরে রোগীদের ক্যাথেটার পড়ানো হয়। যে ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবে মূত্রত্যাগ করতে পারেন না ক্যাথেটার দিয়ে পাইপের সাহায্যে তাঁদের মূত্র বের করা হয়। বেশিদিন ক্যাথেটার পরানো থাকলে খুব সহজেই তার ইউটিআই হতে পারে।

ইউটিআই-এর ফলে ঝুঁকি

- সঠিক সময়ে ঠিকমত চিকিৎসা না করালে একই সমস্যা বারবার হতে পারে।

- মুত্রনালি থেকে ইনফেকশন কিডনি পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে।

- বারবার হলে কিডনি ঠিকমত কাজ করে না। যেখান থেকে পাইলোনেফ্রাইটিস-এর মতো জটিল সমস্যা দেখা দেয়।

- গর্ভাবস্থায় ইউটিআই হলে সময়ের আগেই ডেলিভারি হয়ে যাওয়া, কম ওজনের বাচ্চা জন্ম দেয়া এমনকি গর্ভপাত পর্যন্ত হতে পারে।

- অনেক সময় ইনফেকশনের মাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে তা রক্তে ছড়িয়ে যেতে পারে এবং মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

চিকিৎসা

এই রোগটি জীবাণু দ্বারা হয়ে থাকে বলে একবার ইউটিআই হয়ে গেছে এমনটা নির্নয় হলে তখন অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়া উপায় থাকে না। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে রোগীক সুস্থ করে তোলে। কিন্তু বাজারে তো অনেক ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া যায় কিন্তু সব অ্যান্টিবায়োটিকই যে একজন রোগীর কাজ করবে এমনটা ভাবার কোন কারণ নেই। এটা নির্ভর করে ঐ রোগী কী জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন তার উপর। কারণ এক এক অ্যান্টিবায়োটিক এক এক জীবাণুর প্রতি সংবেদনশীল। তাই ওষুধ খাওয়ার আগে পরিপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ীই খাওয়া উচিত। অনেকের দেখা যায় সঠিক চিকিৎসার অভাবে এই রোগ বারবার ফিরে আসে, সেক্ষেত্রে অল্প মাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা বেশ কার্যকরী।

প্রতিকারে যা করতে পারেন

(১) প্রচুর পরিমাণে পানি পান করুন। দিনে কমপক্ষে ৮ গ্লাস বা অন্তত ৩ লিটার পানি পান করুন।

(২) যখনই প্রস্রাবের বেগ আসবে সাথে সাথে প্রস্রাব করে ফেলুন, আটকিয়ে রাখবেন না।

(৩) পানির পাশাপাশি তরল খাবার যেমন ফলের জুস, ডাবের পানি ইত্যাদি বেশি বেশি পান করুন।

(৪) পাবলিক টয়লেট ব্যবহারের সময় খেয়াল রাখবেন সেটি পরিষ্কার কিনা। হাই কমোড ব্যবহারের সময় সেটা পানি দিয়ে ধুয়ে নিবেন, যদি সম্ভব না হয় তাহলে কমোডের উপর টিস্যু পেপার বিছিয়ে নেবেন এতে করে জীবাণু সহজে আপনার শরীরের সংস্পর্শে আসতে পারবে না।

(৫) একই কাপড় না ধুয়ে বেশিদিন পরিধান করা থেকে বিরত থাকুন। প্যান্টি নিয়মিত ধুয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে। কারণ অনেকদিন যাবত না ধুয়ে ব্যাবহার করলে তাতে জীবাণু বাসা বাধে এবং সংক্রমণ করার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

(৬) প্রস্রাবের পর যৌনাঙ্গ ভালো করে ধুয়ে নিন। মনে রাখবেন, যৌনাঙ্গ পরিষ্কার করার সময় সবসময় সামনে দিক থেকে পেছনে যাবেন, পেছন থেকে সামনে নয়। তা না হলে মলদ্বার থেকে জীবাণু সামনে চলে এসে সংক্রমণের ভয় থাকে।

(৭) সহবাসের পরে অবশ্যই বাথরুমে যান। ব্লাডার খালি করে দেওয়াই ভালো। কেননা ইন্টারকোর্সের সময় ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যায়। সেখান থেকে বিভিন্ন ইনফেকশন হতে পারে। এছাড়াও সেক্সের সময় ব্যবহৃত গর্ভনিরোধ থেকেও সংক্রমণ হতে পারে।

(৮) সর্বপোরি পার্সোনাল হাইজিন বা ব্যক্তি জীবনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

শতকরা ৬০ ভাগ মহিলা জীবনের কোন না কোন পর্যায়ে একবার হলেও ইউটিআই-এ আক্রান্ত হয়ে থাকেন। এই রোগটি সম্পূর্ণ ব্যক্তি জীবনের লাইফস্টাইলের উপর নির্ভরশিল। এটি ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে সংক্রমিত হয় না। এতে প্রথম দিকে তেমন কোন সমস্যা না হলেও বারবার হতেই থাকলে ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে যে কারো জীবনে। তাই সময় থাকতেই নিজের যত্নে সচেতন হন।

 

ছবি- সংগৃহীত: সাজগোজ

সম্পর্কিত লেখা

অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের পূর্বে সতর্কতা
সুস্থতা

অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের পূর্বে সতর্কতা

গ্রিক শব্দ ‘অ্যান্টি’ ও ‘বায়োস’ থেকে ‘অ্যান্টিবায়োটিক’ শব্দটি এসেছে। অ্যান্টি অর্থ বিপরীত ও বায়োস অর্থ জীবন। অর্থাৎ এটি জীবিত মাইক্রোঅর্গানিজমের বিরু...

প্রস্রাব ঝরে পড়ার সমস্যা কেন হয় এবং এই রোগের চিকিৎসা কী?
সুস্থতা

প্রস্রাব ঝরে পড়ার সমস্যা কেন হয় এবং এই রোগের চিকিৎসা কী?

৫৫ বছর বয়সী শাহানা রহমান একটি সমস্যায় পড়েছেন। সিজনাল সর্দি-কাশির কারণে ইদানীং হাঁচি দিলেই তার মূত্রনালী থেকে কয়েক ফোঁটা প্রস্রাব বেরিয়ে আসে। দিনের বেশ...

শিশুর ইউরিন ইনফেকশন নিয়ে চিন্তিত? জেনে নিন করণীয় কী
স্বাস্থ্য

শিশুর ইউরিন ইনফেকশন নিয়ে চিন্তিত? জেনে নিন করণীয় কী

ইউরিন ইনফেকশন যে শুধু বড়দের হয় ব্যাপারটা কিন্তু তা না। বড়দের মতোই বিভিন্ন কারণে শিশুর ইউরিন ইনফেকশন দেখা দিতে পারে মূত্রতন্ত্রের কোনো অংশে জীবাণুর সংক...

প্রস্রাবে জ্বালাপোড়ার কারণ ও ঘরোয়া প্রতিকারের ৫টি উপায়
সুস্থতা

প্রস্রাবে জ্বালাপোড়ার কারণ ও ঘরোয়া প্রতিকারের ৫টি উপায়

আমরা সকলেই প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া বা ইউরিন ইনফেকশনের সাথে কমবেশী পরিচিত। প্রায় প্রত্যেকটি ঘরেই প্রস্রাবে জ্বালাপোড়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি দেখতে পাওয়া যায়। এ...

আরও পড়ুন

কিডনিতে পাথর | কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা!
সুস্থতা

কিডনিতে পাথর | কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা!

বর্তমান সময়ে অনেক প্রচলিত রোগের একটি হল কিডনিতে পাথর। পেছন কোমরে ব্যথা, বারবার প্রস্রাবে সংক্রমণ... এ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে কিডনিতে পাথর ধরা...

জরায়ুতে জীবাণুর সংক্রমণ | পি আই ডি হওয়ার লক্ষণ ও চিকিৎসা কী?
সুস্থতা

জরায়ুতে জীবাণুর সংক্রমণ | পি আই ডি হওয়ার লক্ষণ ও চিকিৎসা কী?

পি আই ডি (পেলভিক ইনফ্লামেটরি ডিজিজ) হচ্ছে জরায়ু এবং ডিম্বনালীতে জীবাণুর সংক্রমণ। মাঝে মাঝে এটি ডিম্বাশয়কেও আক্রান্ত করতে পারে। পি আই ডি (Pelvic Inflam...

ইউরিন ইনফেকশন | প্রসাবে সমস্যার কারণ লক্ষণ ও চিকিৎসা কি?
সুস্থতা

ইউরিন ইনফেকশন | প্রসাবে সমস্যার কারণ লক্ষণ ও চিকিৎসা কি?

প্রায়ই আমরা শুনে থাকি অমুকের ইউরিন ইনফেকশন, আসলে সমস্যাটা কোথায়? এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আগে কখনো সাজগোজে লেখা হয় নি। কিন্তু এটা খুবই দরকার ছি...

বাচ্চাদের কৃমির সংক্রমণ | কীভাবে হয় এবং প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নিবেন?
মা ও শিশু

বাচ্চাদের কৃমির সংক্রমণ | কীভাবে হয় এবং প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নিবেন?

আমাদের দেশে বাচ্চাদের কৃমির সংক্রমণ খুব কমন একটি বিষয়। কৃমি শুধু বাসার ছোটদের নয়, বড়দেরও হতে পারে। অনেকের ধারনা চিনি বা গুড় খেলে কৃমি হয়, এ ধারণা ভুল...

জরায়ু নিচে নেমে যাওয়া | ইউটেরাইন প্রলাপ্স এর ধরণ, কারণ ও চিকিৎসা কী?
সুস্থতা

জরায়ু নিচে নেমে যাওয়া | ইউটেরাইন প্রলাপ্স এর ধরণ, কারণ ও চিকিৎসা কী?

মেয়েদের জীবনকালের কোন না কোন সময়, নিজের বা কাছের কারো জরায়ু নিচে নেমে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক একটি ঘটনা। একটু সচেতন থাকলেই নিজের, কাছের বান্ধবীদের পরামর...

যৌনাঙ্গে ইচিং বা চুলকানি | অসুখটির কারণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধ জানেন কি?
স্বাস্থ্য

যৌনাঙ্গে ইচিং বা চুলকানি | অসুখটির কারণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধ জানেন কি?

আমরা যারা মেয়ে, আমাদের প্রতিদিন কতই না সমস্যার মোকাবেলা করতে হয়। ঘর থেকে শুরু করে শরীর সব দিক থেকে অনেক ঝামেলায় পড়তে হয়। আজকে মেয়েদের একটি অতি...

…