আপনার সন্তানটি নিরাপদে বেড়ে উঠছে তো?

ফারহানা হক অনি · Jan 31, 2018 · 1 min read

আপনার সন্তানটি নিরাপদে বেড়ে উঠছে তো?

আমরা সবাই কমবেশি আমাদের বাচ্চাদের অপরিচিত মানুষদের থেকে কীভাবে নিজেদের নিরাপদ রাখতে হয় এই শিক্ষা দেই। কিন্তু বিপদ কি সবসময় অপরিচিতদের দ্বারা হয়? পরিস্যংখান বলে শতকরা ৭৫% শিশুই তার পরিচিত বা আত্মীয়দের দ্বারা নিপীড়িত হয়। চলুন জেনে নেই কিছু তথ্য যা জেনে রাখলে বুঝবেন আপনার সন্তানটি নিরাপদে বেড়ে উঠছে কিনা।

কী করে বুঝবেন আপনার সন্তানটি নিরাপদে বেড়ে উঠছে? 

(১) একটা ব্যাপার অবশ্যই খেয়াল রাখবেন, নির্যাতনকারীর কাছে শিশুটি ছেলে নাকি মেয়ে তা ব্যাপার নয়। নিপীড়নকারী হল কিছু বিকৃত রুচির লোক যারা ছোটদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। ইংরেজিতে এদের বলে পেডোফাইল (Pedophile), এবং এই বিকৃতিকে বলে পেডোফিলিয়া। নিপীড়িত শিশুদের মধ্যে ২৫%-ই ছেলে। সুতরাং নিচের সব রুলস শুধু মেয়েদের বেলায় প্রযোজ্য আর আপনার ছেলে শিশুটি সেইফ, এমন কখনোই ভাবতে যাবেন না। আত্মরক্ষার কৌশল জানা ছেলে-মেয়ে, ছোট-বড় সবারই জানা জরুরি।

(২) প্রথমেই শিশুকে শিখান বাবা-মা, ভাইবোন ছাড়া অন্য যে কারো কাছ থেকে কতটুকু দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। শিশুকে তার ব্যক্তিগত শারীরিক সীমা সম্পর্কে শিক্ষা দিন। তার শরীরের সেইফজোন আর আন-সেইফজোন সম্পর্কে ধারণা দিন। তাকে বোঝান যে ঠিক কতটুকু কাছে সে কাউকে আসতে দেবে আর কতটুকু কাছে আসলে আপত্তি প্রকাশ করতে হবে।

(৩) মনে রাখবেন, বেশিরভাগ সময় শিশু আপনারই কোন আত্মীয় অথবা পরিচিত মানুষ যাকে আপনি বিশ্বাস করেন, তার দ্বারা নিপীড়িত হয়। তাই আপন পরিবারের সদস্য ছাড়া অন্য কারো কাছে শিশুকে দিবেন না। কেউ আপনার শিশুর প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ দিচ্ছে কিনা লক্ষ্য রাখুন; বেশি করে আদর করা অথবা শিশুকে খুশি করার জন্য তার প্রিয় উপহার অথবা চকলেট দিয়ে তাকে কোলে নেয়ার চেষ্টা করছে কিনা খেয়াল রাখুন। শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সবার আগে আপনাকেই মনযোগী ও সাবধান হতে হবে।

(৪) কোন আত্মীয় বা পরিচিত কারো সাথে কখনোই শিশুকে একা কোথাও যেতে দিবেন না। তাকে কারো কাছে রেখে কোথাও যাবেন না। বাসায় একা রেখে না যাওয়ার চেষ্টা করবেন, আর গেলেও তাকে শিখিয়ে দেবেন বাবা-মা ছাড়া আর কেউ আসলে কোন অবস্থাতেই যেন দরজা না খুলে। কেননা, এসব ঘটনা বেশিরভাগ সময় আপনি যাদের বিশ্বাস করছেন তাদের দ্বারাই হয়ে থাকে।

(৫) আপনার শিশুর আচরণের দিকেও মনোযোগ দিন। কোন আত্মীয়র প্রতি শিশুর বিরূপ মনোভাব দেখলে সাবধান হয়ে যান এবং এর কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন। হয়ত তার কাছে যেতে আপনার শিশুটি অস্বস্তিবোধ করছে, কিংবা তাকে দেখে ভয় পাচ্ছে অথবা কাঁদছে; এমন ক্ষেত্রে কখনই তাকে জোর করবেন না বরং সুন্দরভাবে কথা বলে কারণ জানার চেষ্টা করুন।

সন্তানকে জড়িয়ে ধরেছেন একজন মা

(৬) শিশুকে শিক্ষা দিন কীভাবে এবং কোথায় স্পর্শ করা অগ্রহণযোগ্য। অপরিচিত হোক বা খুব কাছের কেউ, কোন অবস্থাতেই যেন কেউ অস্বস্তিকরভাবে তাকে টাচ না করে এবং এমন কিছু হলে যেন আপনাকে জানায়।

(৭) স্কুল থেকে আনা নেওয়া করার জন্য যত বছরের পুরনো ড্রাইভারই হোক, তাদের দায়িত্ব দেবেন না কিংবা জরুরী প্রয়োজনে দিলেও বাসায় আসার পর শিশুর কাছ থেকে পরোক্ষভাবে জেনে নিশ্চিন্ত হয়ে নিন।

(৮) শিশু যদি কারো ব্যাপারে আপনার কাছে শেয়ার করে, তাকে সাহস আর আশ্বাস দিন। আপনার অনেক কাছের কারোর ব্যাপারে হলেও শিশুকে অবিশ্বাস করবেন না, তাকে লোকলজ্জার ভয়ে চুপ থাকতে বলবেন না বরং অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিন। চুপ থাকা কোন সমাধান না, ছোটবেলার খুব ছোট ছোট বাজে অভিজ্ঞতার স্মৃতি সারাজীবন তাদের ট্রমা হিসেবে বয়ে বেরাতে হয়।

(৯) আপনার ছেলে-মেয়ে যদি অ্যাবিউজড হয়, তাহলে তাকে দোষারোপ করতে যাবেন না। মনে রাখবেন, মানসিক বিকারগ্রস্ত লোকের কাছে নির্যাতন করার জন্য কোন কারণ বা লজিক লাগে না। ভিকটিম ব্লেমিং না করে অপরাধীর বিরুদ্ধে অবস্থান করুন। বাংলাদেশে এখন চিলড্রেন এন্ড উইমেন অ্যাবিউজ (নারী ও শিশু নির্যাতন) আইন বেশ কঠোর। তাই, উপযুক্ত আইনের আশ্রয় নিন।

বিপদের মুখোমুখি হলে কী করবে?

(১) বাবা-মার নাম করে স্কুল থেকে কিডন্যাপাররা শিশুদের নিয়ে যেতে পারে এমন ভয় মোটামুটি সব শিশুকেই দেখানো হয়। কিন্তু সত্যি সত্যি এমন পরিস্থিতিতে পরলে কি করতে হবে তা শেখানো হয় না। ১টা কোড ওয়ার্ড ঠিক করুন। এমন ১টা শব্দ যা শুধু শিশু এবং তার মা-বাবা জানবে। খুব অদ্ভুত কোন শব্দ না আবার একদম সাধারণ কোন লাইন ও যেন না হয়। আপনি স্কুলে অন্য কাউকে পাঠালে শিশুকে বলুন নিশ্চিত হয়ে নিতে ঐ শব্দ ব্যবহার করে যে গিয়েছে তাকে আপনিই পাঠিয়েছেন কিনা। কিন্তু পারতপক্ষে এরকম কাউকে না পাঠানোই বেটার যাকে আপনার শিশু ভালোভাবে চিনে না।

(২) শিশুকে অপরিচিত কারো হাত থেকে খাবার নিতে নিষেধ করবেন। এমন কি রাস্তা থেকে খাবার কিনে খাওয়ার ব্যাপারেও সাবধান করুন। কিছুদিন আগে ভারতে এমন নিউজ হয়েছিল যেখানে দেখায় কীভাবে কিডন্যাপারদের একটি চক্র রাস্তার ঝালমুড়ি, ফুচকাওয়ালাদের সাথে মিলে খাবারে ঘুমের ঔষধ মিশিয়ে দেয়।

(৩) আপনার মেয়েটি রাস্তায় একা চলার পথে তাকে যদি কেউ ফলো করে তাহলে তাকে বলুন যেন যতোটা সম্ভব জোরে চিৎকার করে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে। আর যদি কোন গাড়ি পিছনে আসতে থাকে তাহলে যেন সে গাড়ির উলটো দিকে দৌড়াতে শুরু করে, তাহলে গাড়ি ঘুরিয়ে আসার ফাঁকে সে অনেকটা দূর যেতে পারবে।

(৪) হঠাৎ যদি কোন গাড়ি পাশে এসে থামিয়ে তাকে ভিতরে নেয়ার চেষ্টা করে, তাহলে যতোটা সম্ভব জোরে হাত-পা ছুঁড়তে হবে, কোনভাবেই যেন গাড়ির ভিতরে ঢুকাতে না পারে।

(৫) একটু বয়স হলেই আপনার ছেলে এবং মেয়েকে বেসিক আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ দিন। এখন শহরের বিভিন্ন জায়গায় মার্শাল আর্ট, কারাতে, জুডো, তায়কোয়ান্দ, ক্রাভ-মাগা ইত্যাদি শেখানোর একডেমি আছে। এগুলো শিখে রাখা ছেলে-মেয়ে সবার জন্যই সমান ইম্পরট্যান্ট। যেকোনো ইমারজেন্সি সিচুয়েশনে নিজেকে বাঁচাতে কী কী করতে হবে তা জানা থাকলে আপনি অনেকটাই নিশ্চিন্তে তাদের বের হতে দিতে পারবেন।

আপনার সন্তানটি নিরাপদে বেড়ে উঠছে কিনা তা এখন আশা করি বুঝতে পেরেছেন। আপনার সন্তানটি নিরাপদে বেড়ে এই কামনা রইলো, ভালো থাকবেন।

ছবি - সংগৃহীতঃ সাটারস্টক

সম্পর্কিত লেখা

গুড টাচ ও ব্যাড টাচ এর পার্থক্য শিশুকে কীভাবে বোঝাবেন?
মা ও শিশু

গুড টাচ ও ব্যাড টাচ এর পার্থক্য শিশুকে কীভাবে বোঝাবেন?

পরিবারে নতুন সদস্যের আগমন সবসময়ই আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। কিন্তু বাচ্চা যত বড় হয়, বাবা মায়ের মনের ভিতরে নতুন ভয়ের জন্ম নেয়। আমার বাচ্চাটা সেইফ আছে তো,...

নবজাতক শিশুর যত্নে যে বিষয়গুলো অবশ্যই খেয়াল রাখবেন
মা ও শিশু

নবজাতক শিশুর যত্নে যে বিষয়গুলো অবশ্যই খেয়াল রাখবেন

পরিবারে যখন নতুন অতিথি আসে আমাদের খুশির সীমা থাকে না। সবাই প্রস্তুতি নিতে থাকে নতুন শিশুর আগমন উপলক্ষে। এতকিছুর মাঝেও থাকে হাজার রকমের চিন্তা। কীভাবে...

৩টি কার্যকরী পদ্ধতিতে সহজেই হবে শিশুর ঘুমের সমস্যার সমাধান
মা ও শিশু

৩টি কার্যকরী পদ্ধতিতে সহজেই হবে শিশুর ঘুমের সমস্যার সমাধান

নবজাতক বা ছোট শিশুদের ঘুম নিয়ে অনেক অভিভাবকই চিন্তিত হয়ে থাকেন। অনেকেই অভিযোগ করেন যে বাচ্চার ঘুম খুব কম বা বাচ্চা রাতে ঠিকমতো ঘুমায় না। প্রতিদিন ১৬ ঘ...

শিশুর অবাঞ্চিত হেঁচকি ওঠা বন্ধে ১০টি টিপস!
মা ও শিশু

শিশুর অবাঞ্চিত হেঁচকি ওঠা বন্ধে ১০টি টিপস!

নবজাতক থেকে শুরু করে সব বয়সের অনেক শিশুরই দেখা যায় খাওয়ানোর সময় অযাচিত হেঁচকি উঠতে থাকে। যদিও হেঁচকির ব্যাপারটি বেশ স্বাভাবিক, কিন্তু অনেক সময় বাবা মা...

আরও পড়ুন

যত্নে বেড়ে উঠুক সোনামণি
মা ও শিশু

যত্নে বেড়ে উঠুক সোনামণি

গর্ভধারণ থেকে শুরু করে ১৮ বছর বয়সের নিচের সবাইকে শিশু কিশোর বলা হয়। এর ভেতর ১ বছরের নিচে যাদের বয়স তারা ইনফ্যান্ট, ১ থেকে ৩ বছর পর্যন্ত টোডলার বেবি...

শিশুর ওজন না বাড়ার পিছনে কারণগুলো কী হতে পারে?
মা ও শিশু

শিশুর ওজন না বাড়ার পিছনে কারণগুলো কী হতে পারে?

মিথিলা ডায়াপারের প্যাকেটের হাস্যোজ্জ্বল, স্বাস্থ্যবান শিশুর দিকে তাকিয়ে আছে, আর ভাবছে তার নবজাতক শিশুটি কীভাবে এমন স্বাস্থ্য পেতে পারে! তার বাচ্চাটি...

শিশুর শরীরে আয়রনের ঘাটতি হলে কী করে বুঝবেন?
মা ও শিশু

শিশুর শরীরে আয়রনের ঘাটতি হলে কী করে বুঝবেন?

মানব দেহের বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য যত রকম পুষ্টি প্রয়োজন তার মধ্যে আয়রন অন্যতম। জন্মের পর প্রথম পাঁচ বছরে শিশুর সব রকম বিকাশের মূল ভিত্তি স্থাপন হয়। এই...

শিশুকে খাবার খাওয়ান ১২টি কার্যকরী পদ্ধতির সাহায্যে!
মা ও শিশু

শিশুকে খাবার খাওয়ান ১২টি কার্যকরী পদ্ধতির সাহায্যে!

একজন মা হিসেবে আপনি অনেক হতাশ হতে পারেন যখন কোনও একটি সুস্বাস্থ্যকর খাবার আপনি অনেক যত্ন ও ভালোবাসা নিয়ে তৈরি করলেন এবং আপনার বাচ্চাটি এসে সেই খাবারটি...

দুর্ঘটনার পর শিশুর ট্রমা কাটিয়ে তুলতে বাবা-মা কীভাবে সাহায্য করবেন?
মা ও শিশু

দুর্ঘটনার পর শিশুর ট্রমা কাটিয়ে তুলতে বাবা-মা কীভাবে সাহায্য করবেন?

দুর্ঘটনার পর শিশুর ট্রমা যেন নিঃশব্দ এক ভূমিকম্পের মতো—চোখে দেখা যায় না, অথচ ভেতরে সবকিছু ভেঙেচুরে দেয়। একটা হঠাৎ আগুন লাগা বা বিস্ফোরণের ঘটনা, কোনও গ...

দুই বছরের কম বয়সী শিশুর খাদ্য ও পুষ্টি
মা ও শিশু

দুই বছরের কম বয়সী শিশুর খাদ্য ও পুষ্টি

নতুন মায়েদের জন্য ,যারা ভবিষ্যতে মা হবেন তাদের জন্য এবং যেসব মা আবারও মা হবেন তাদের জন্য আজকের এই লেখা । আমাদের দেশে শিশু জন্মের পর থেকে বিভিন্ন ধরনের...

…