টেরিবল টু | বাচ্চার অতিরিক্ত জেদ কীভাবে সামলাবেন?

নাইমা আক্তার · Aug 27, 2023 · 1 min read

টেরিবল টু | বাচ্চার অতিরিক্ত জেদ কীভাবে সামলাবেন?

প্রতিটি শিশুই আলাদা। একেকজনের বেড়ে ওঠার পরিবেশ, আচরণ, মানসিক বিকাশ খুব স্বাভাবিকভাবেই ডিফারেন্ট হবে। শিশুর বয়স যখন দুই বছরের কাছাকাছি চলে আসে, তখন তার বদমেজাজী হয়ে উঠা বা অল্পতেই রেগে যাওয়া খুব কমন একটি ব্যাপার। আপনার যদি দুই বছর বা তার কাছাকাছি বয়সের কোনো বাচ্চা থেকে থাকে, তাহলে ‘টেরিবল টু’ টার্মটির সাথে আপনি হয়তোবা পরিচিত। হুট করেই কি আপনার বাচ্চা রেগে যাচ্ছে, অতিরিক্ত জেদ করছে? কীভাবে সামলাবেন এই পরিস্থিতি? চলুন জেনে নেই আজ।

টেরিবল টু কি স্বাভাবিক বিষয়?

দুই বছর বা তার কাছাকাছি বয়সের বাচ্চাদের কিছু আচরণগত পরিবর্তন দেখা যায়। এটি শিশুর বিকাশের একটি স্বাভাবিক পর্যায়। এই বয়সী কোনো বাচ্চার ঘন ঘন মেজাজের পরিবর্তন, সব কিছুতেই ‘না’ বলা ও ছোটখাটো বিষয়ে চিৎকার করা – এই বিষয়টিকেই শিশু বিশেষজ্ঞরা ‘টেরিবল ২’ নামে আখ্যায়িত করেছেন। এই ধাপটি খুব বেশিদিন স্থায়ী হয় না। তাই যারা বাচ্চার এই ফেজ নিয়ে চিন্তিত, তারা কীভাবে এই পরিস্থিতি সহজে সামলে উঠবেন তা নিয়েই আজকের আর্টিকেলে কিছু টিপস শেয়ার করবো।

টেরিবল টু

এই ফেজ কখন শুরু হয়?

সাধারণত ১৮ মাস শুরু হওয়ার পর থেকে বাচ্চাদের মধ্যে টেরিবল ২ এর কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। বেশিরভাগ শিশু ২ থেকে ৩ বছর বয়সের মধ্যে আক্রোশ ও বিরোধীতা প্রদর্শন করতে শুরু করে। এই লক্ষণগুলো সাধারণত ৩/৪ বছর বয়স পর্যন্ত চলতে পারে। অনেক বাবা-মা এই সময়ে বেশ হতাশ হয়ে যান, তবে মনে রাখতে হবে বাচ্চাদের স্বাভাবিক বৃদ্ধিরই একটি অংশ এটি।

টেরিবল টু এর লক্ষণ কী?

এর কমন লক্ষণ হলো যে আপনার বাচ্চাকে আপনি যা করতে বলবেন তাতে সে রিঅ্যাক্ট করবে, অকারণেই জেদ করবে। বাবা-মায়েরা খুব সহজেই এই আচরণগত পরিবর্তন চিহ্নিত করতে পারেন। জামাকাপড়/ ডায়পার চেঞ্জ না করতে চাওয়া, খেলনা ছুড়ে ফেলা, জোরে কান্নাকাটি, ঘন ঘন মেজাজের পরিবর্তন, খেতে বা ঘুমাতে না চাওয়া, এমনকি বেশি রেগে গেলে কামড়ানো, আঘাত করা ইত্যাদি টেরিবল টু এর সাধারণ লক্ষণ। এই সময়ে বাচ্চারা নিজের মনের ভাব পুরোপুরি বোঝাতে পারে না, তাই খুব সহজেই তাদের মেজাজের পরিবর্তন ঘটে।

কীভাবে সামলাবেন?

ধৈর্য ধরুন

বাচ্চা যতই জেদ করুক না কেন, আপনাকে মাথা ঠান্ডা রেখে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। কারণ আপনিও যদি সেই সময়ে রেগে যান তাহলে বাচ্চা ভয় পাবে কিংবা আরও বেশি অ্যাগ্রেসিভ বিহেভ করবে। তাই ধৈর্য ধরতে হবে, এই সময়টা কিন্তু বেশিদিন স্থায়ী হবে না। বাচ্চা জেদ করলে ইগনোর করুন এবং অন্যদিনে তার মাইন্ড ডাইভার্ট করার ট্রাই করুন।

টেরিবল টু
পজেটিভ থাকুন

সন্তানের সাথে সবসময় ইতিবাচক আচরণ করা উচিত। এতে সে পজেটিভ মাইন্ড নিয়ে বড় হয়। ভালো কিছু করলে প্রশংসা করা ও ভুল করলে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দেওয়া ইতিবাচক আচরণের অন্তর্ভুক্ত। এগুলো আপনার সন্তানকে শেখাবে কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য ও কোনটি নয়। ছোট থেকেই সে পজেটিভ মেন্টালিটি নিয়ে বড় হবে।

তাকে চয়েস অপশন দিন

বাচ্চার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এটা বোঝাতে মাঝেমধ্যে তাকে ‘চয়েস অপশন’ বা যেকোনো দু’টি থেকে একটি বেছে নিতে বলুন। তাকে প্রায়োরিটি দিন, তবে এই বয়সে শিশুকে কোনো কিছুর উপর নিয়ন্ত্রণ দিবেন না, সিদ্ধান্ত আপনারই নিতে হবে।

রুটিন সেট করুন
এই বয়সে বাচ্চারা নিয়ম-কানুন মেনে চলতে চায় না। কিন্তু বাবা-মায়ের উচিত তার রুটিন সেট করে দেওয়া। খাওয়ার সময় খাওয়া, ঘুমের সময় ঘুম ও খেলার সময় খেলা। বাচ্চাকে অর্গানাইজড ওয়েতে বড় করার পারফেক্ট সময় এটি। রুটিনে যখন বাচ্চা অভ্যস্ত হয়ে যাবে, তখন আপনারই সুবিধা হবে। বাচ্চার রুটিন সেট করা
কাজে উৎসাহী করে তুলুন

শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে ২ বছর বয়সে বাচ্চারা তাদের ফিলিংস কন্ট্রোল করা শিখতে পারে যদি তাদের প্রোপার ট্রেইনিং দেওয়া যায়। বাচ্চা যখন ভালো কাজ করবে, সঠিক আচরণ করবে; তখন তাকে পুরস্কৃত করুন ও বাহবা দিন। তাহলে সে এই কাজে আরও উৎসাহী হয়ে উঠবে। খেলনা গুছিয়ে রাখা, গাছে পানি দেওয়া, নিজের হাতে খাওয়া, কাপড় ভাজ করে রাখা- এই ধরনের কাজে তাকে উৎসাহ দিন। এতে তার অস্থিরতা কমবে।

কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিবেন?

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে টেরিবল টু স্টেজ বাচ্চার জন্য একদম স্বাভাবিক বিষয় এবং আপনার সন্তানের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে এর ভূমিকা রয়েছে। তবে বাচ্চার কিছু অস্বাভাবিক আচরণ, যেমন - রাগের বসে মাথায় আঘাত করা, নিজেকে আঁচড় দেওয়া বা দেওয়ালে আঘাত করা, ঘরের জিনিসপত্র ভেঙে ফেলা ইত্যাদি যদি বার বার করতে থাকে, তাহলে দ্রুত একজন চাইল্ড নিউরোলজিস্টের সাথে কনসাল্ট করুন। আপনার শিশুর যদি ডেভেলপমেন্টাল ডিলে থাকে, কমান্ড না ফলো করে, সেই সাথে চঞ্চলতা অস্বাভাবিক পর্যায়ে চলে যায়, সেক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

 

টেরিবল টু আসলে বাচ্চার দৈহিক ও মানসিক বিকাশের একটি স্বাভাবিক ধাপ। তবে, বাচ্চার অতিরিক্ত জেদ প্রশ্রয় না দিয়ে ধৈর্য ধরুন। বাবা-মায়ের উচিত সন্তানকে কোয়ালিটি টাইম দেওয়া, স্ক্রিন টাইম কমিয়ে আনা, অন্য বাচ্চাদের সাথে খেলার সুযোগ করে দেওয়া। প্রতিটি শিশু যেন সুস্থ-স্বাভাবিক পারিবারিক পরিবেশে বড় হতে পারে, সেটিও আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। আজ তাহলে এই পর্যন্তই। ভালো থাকুন।

ছবি- সাটারস্টক

Products in this article

সম্পর্কিত লেখা

বাচ্চাদের হুটহাট জেদ এবং একরোখা স্বভাব কীভাবে কন্ট্রোল করবেন?
মা ও শিশু

বাচ্চাদের হুটহাট জেদ এবং একরোখা স্বভাব কীভাবে কন্ট্রোল করবেন?

খুব জরুরী একটা কল করতে হবে, কিন্তু বাচ্চার হাত থেকে কোনোভাবেই ফোনটা নেয়া যাচ্ছে না! যতই তাকে বুঝাচ্ছেন বা আদর করে বলছেন। কিন্তু না! তার হুটহাট জেদ এবং...

প্যারেন্টিং | ভুল করতে করতে শেখা!
সম্পর্ক

প্যারেন্টিং | ভুল করতে করতে শেখা!

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় প্যারেন্টিং। শিরোনাম দেখে ভ্রু কুঁচকানোর অনেক কারণ আছে। একটা বলি। বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ বাবা-মা, চারদিকে অযুত নিযুত উপদেশ। এর...

যত্নে বেড়ে উঠুক শিশু
মা ও শিশু

যত্নে বেড়ে উঠুক শিশু

আজকা্ল শহরে ছোট পরিবারের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। যৌথ পরিবার প্রায় দেখাই যায় না। তাই অনেক সময়ই বাচ্চারা বেড়ে ওঠে একা একা। একারনে কারনে বাচ্চাদের প্রতি মা...

ম্যাটারনিটি লিভ শেষে কাজে ফিরতে নিজেকে প্রস্তুত করবেন কীভাবে?
মা ও শিশু

ম্যাটারনিটি লিভ শেষে কাজে ফিরতে নিজেকে প্রস্তুত করবেন কীভাবে?

মাতৃত্বকালীন ছুটি বা ম্যাটারনিটি লিভ যেটাই বলি না কেন, প্রত্যেকটি মায়ের কাছে এই সময়টা খুবই স্পেশাল। বাচ্চা হওয়ার পর মায়েরা আস্তে আস্তে নতুন রুটিনে অভ্...

আরও পড়ুন

বাচ্চাদের টয়লেট ট্রেনিং কীভাবে দিবেন?
মা ও শিশু

বাচ্চাদের টয়লেট ট্রেনিং কীভাবে দিবেন?

দেখতে দেখতে আদরের সোনামণিটা বড় হয়ে যাচ্ছে! ছয় মাসের পর থেকে সলিড বা দানাদার খাবার খাওয়া শুরু করেছে। আবার আধো আধো কণ্ঠে বাবা মা ডাকটাও শিখে গেছে। এই সম...

আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা কম থাকার ৯টি লক্ষণ
সম্পর্ক

আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা কম থাকার ৯টি লক্ষণ

তিথির খুব কাছের বান্ধবী মিতু। ভার্সিটি বন্ধ হবার পরে দিনের মধ্যে বেশ কয়েকবার তাদের ফোনে কথা হয় । তিথির সাথে ফোনে কথা বলার পর প্রায়শই তার মন খারাপ হয়ে...

সোনামণি খাবে নিজের ইচ্ছাতেই
মা ও শিশু

সোনামণি খাবে নিজের ইচ্ছাতেই

আজকাল মায়েদের মুখে প্রায়ই একটা অভিযোগ শুনতে পাওয়া যায়- তার বাচ্চা খেতে চায়না বা যুদ্ধ করে অনেকক্ষণ ধরে খাওয়াতে হয়। আসলেই কি তাই? খিদে পেলেও খেতে চায়না...

প্রিম্যাচিউর বেবি বার্থ এর কারণ ও শারীরিক জটিলতা নিয়ে জরুরি তথ্য
মা ও শিশু

প্রিম্যাচিউর বেবি বার্থ এর কারণ ও শারীরিক জটিলতা নিয়ে জরুরি তথ্য

একটি পরিবারের সবচেয়ে আনন্দঘন মুহূর্ত হচ্ছে, যখন সেই পরিবারে একজন নতুন অতিথির আগমন ঘটে। নবজাতকের জন্ম বাবা-মা সহ পরিবারের সবার জীবনে নিঃসন্দেহে অত্যন্ত...

শিশুকে খাবার খাওয়ান ১২টি কার্যকরী পদ্ধতির সাহায্যে!
মা ও শিশু

শিশুকে খাবার খাওয়ান ১২টি কার্যকরী পদ্ধতির সাহায্যে!

একজন মা হিসেবে আপনি অনেক হতাশ হতে পারেন যখন কোনও একটি সুস্বাস্থ্যকর খাবার আপনি অনেক যত্ন ও ভালোবাসা নিয়ে তৈরি করলেন এবং আপনার বাচ্চাটি এসে সেই খাবারটি...

সন্তানের সাথে বন্ধুত্ব | ১০টি উপায় জানা আছে কি?
মা ও শিশু

সন্তানের সাথে বন্ধুত্ব | ১০টি উপায় জানা আছে কি?

একটি সন্তান জন্মের সাথে সাথে জন্ম হয় বাবা-মায়ের। জন্মের পর থেকে পাঁচ-ছয় বছর পর্যন্ত আপনার শিশুকে যা শেখাবেন কিংবা যা শিখবে সেটাই আপনার শিশুর ব্যক্ত...

…